মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, চট্টগ্রামের অধীন এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ১০ লাখের বেশি শিক্ষার্থীর রোল, রেজিস্ট্রেশন নম্বর, জন্মতারিখ ও বিষয়ভিত্তিক জিপিএসহ স্পর্শকাতর ব্যক্তিগত তথ্য অননুমোদিত বেসরকারি ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। এতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী মারাত্মক সাইবার ঝুঁকি ও সামাজিক প্রতারণার আশঙ্কায় পড়েছে। তবে নিরাপত্তাঝুঁকির এই ভয়াবহ বিষয়টি শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ অস্বীকার করে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সম্মতি ছাড়াই গত চার বছরে (২০২৩-২০২৬) অনুষ্ঠিত পরীক্ষার সংবেদনশীল এসব তথ্য বিভিন্ন থার্ডপার্টি ওয়েবসাইটে দেখা যাচ্ছে। অনুসন্ধানে এমন অন্তত তিনটি অননুমোদিত ওয়েবসাইটের ডোমেইনের সন্ধান পাওয়া গেছে—যার দুটির ডোমেইন ‘ভারসেল ডট অ্যাপ’ (vercel.app) এবং অন্যটি ‘গিটহাব ডট আইও’ (github.io)।
ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত স্পর্শকাতর তথ্য
সরকারি অনুমোদিত পোর্টালে সার্চ দিলে সাধারণত ফলাফল ও গ্রেডসহ ১১টি তথ্য প্রদর্শিত হয়। কিন্তু অননুমোদিত এসব ওয়েবসাইটে রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বরের বিপরীতে পরীক্ষার্থীদের নাম, মা-বাবার নাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জন্মতারিখ, মেরিট র্যাংক, মোট প্রাপ্ত নম্বর ও বিষয়ভিত্তিক জিপিএসহ অন্তত ১৪ ধরনের তথ্য সরাসরি পাওয়া যাচ্ছে।
উন্মুক্ত হওয়া তথ্যের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বোর্ডে এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল ৭ লাখ ২২ হাজার ৩৯৯ জন এবং ২০২৩ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে ৩ লাখ ১০ হাজার ১৩৬ জন। সব মিলিয়ে মোট ১০ লাখ ৩২ হাজার ৫৩৫ জন শিক্ষার্থীর তথ্য এসব অননুমোদিত প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়েছে।
আইন লঙ্ঘন ও নিরাপত্তাঝুঁকি
ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন ২০২৬ এবং আন্তর্জাতিক ডেটা প্রাইভেসি নীতিমালা অনুযায়ী, জন্মতারিখ, মা-বাবার নাম, প্রাতিষ্ঠানিক রোল ও রেজিস্ট্রেশন ‘ব্যক্তিগতভাবে শনাক্তযোগ্য তথ্য’ (পিআইআই) হিসেবে গণ্য। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের সিংহভাগ শিক্ষার্থী অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তাদের অভিভাবকের স্পষ্ট অনুমতি ছাড়া এসব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ডেটা স্ক্র্যাপিংয়ের ঘটনা নয়; বরং বোর্ডের অভ্যন্তরীণ ডেটাবেজ বা এপিআই (অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস) থেকে তথ্য হ্যাক করা হয়ে থাকতে পারে।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সহকারী অধ্যাপক মীর মু. সাক্বী কাওসার বলেন, “শিক্ষা বোর্ড যা প্রকাশ করেনি, তা থার্ডপার্টি ওয়েবসাইটে পাওয়ার অর্থ হলো ডেটাবেজ হ্যাক হয়েছে। এসব সংবেদনশীল তথ্য পাবলিক ডোমেইনে চলে আসায় শিশুরা ভুয়া পরিচয় তৈরি বা ‘আইডেন্টিটি থ্যাফট’-এর মতো মারাত্মক সাইবার অপরাধ, বাণিজ্যিকভাবে হয়রানি ও আর্থিক প্রতারণার ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এর পুরো দায় শিক্ষা বোর্ডকে নিতে হবে।”
ডিজিটাল অধিকার ও সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ডিজিটালি রাইট’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুতর এবং এটি বোর্ডের ডিজিটাল অবকাঠামোর নিরাপত্তাব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আইন লঙ্ঘনের দায়ে শিক্ষা বোর্ডকে অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।”
শিক্ষা বোর্ডের দায় এড়ানোর চেষ্টা
তথ্য ফাঁসের অভিযোগ অস্বীকার করে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী দাবি করেন, “বোর্ড থেকে কোনো ব্যক্তিগত তথ্য উন্মুক্ত করা হয়নি এবং আমাদের মূল ডেটাবেজ হ্যাক হওয়ার সুযোগ নেই। ফলাফল প্রক্রিয়াকরণের জন্য আমরা বুয়েট, চিটাগং ডকইয়ার্ড লিমিটেড ও টেলিটককে তথ্য সরবরাহ করে থাকি; সেখান থেকে কিছু ঘটে থাকতে পারে।” তবে এতে বড় কোনো ঝুঁকি তৈরি হবে না বলেও দাবি করেন তিনি।


