সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ এবং দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় দারা প্রদেশের রাজনৈতিক নিরাপত্তাবিষয়ক সাবেক প্রধান আতেফ নাজিবকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দেশটির গৃহযুদ্ধের সময় সংঘটিত অপরাধের দায়ে তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করার পর এ সাজা দেওয়া হলো।
উল্লেখ্য, সিরিয়ার ইসলামপন্থী নেতা আহমেদ আল-শারার (বর্তমান প্রেসিডেন্ট) নেতৃত্বে দেশটির বিদ্রোহীরা বাশার আল-আসাদ সরকারকে উচ্ছেদ করার সময় তৎকালীন এই প্রেসিডেন্ট পালিয়ে রাশিয়ায় চলে যান। এখনো সেখানেই অবস্থান করছেন তিনি।
গতকাল মঙ্গলবার দামেস্কের ফৌজদারি আদালত বাশার আল-আসাদকে ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের’ দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেন। আর আতেফ নাজিবকে পরিকল্পিত ‘হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের’ দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।আদালত বলেছেন, ২০১১ সালে দারা প্রদেশে বাশার আল-আসাদ সরকারের সংঘটিত অপরাধগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।
আরব বসন্তে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে স্বৈরশাসকদের পতন ঘটেছিল। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি টিকে গিয়েছিলেন।
ক্ষমতার প্রথমদিকে বাশার আল-আসাদ সংস্কারের ব্যাপারে উদ্যোগী হন। বাবার ২৯ বছরের শাসনামলের বেশ কিছু নিষেধাজ্ঞা তিনি শিথিল করেন। কিন্তু পরে সংস্কারকের ভূমিকা থেকে বাবা হাফিজ আল-আসাদের মতোই একজন কর্তৃত্ববাদী ‘স্বৈরশাসকে’ পরিণত হন।
সিরিয়ায় আরব বসন্তের ঢেউ লাগে ২০১১ সালের মার্চে। দেশটিতে শুরু হয় বাশার আল-আসাদবিরোধী বিক্ষোভ। বিক্ষোভ দমনে সহিংস উপায় বেছে নেন বাশার। সরকারি দমন-পীড়নের মুখে একপর্যায়ে বাশার আল-আসাদবিরোধীরা হাতে অস্ত্র তুলে নেন। শুরু হয় এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ। সিরিয়াজুড়ে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামে। এ লড়াইয়ে একের পর এক এলাকা বাশার আল-আসাদ সরকারের হাতছাড়া হয়। সিরিয়া সংকটে জড়িয়ে পড়ে আঞ্চলিক শক্তি থেকে বৈশ্বিক পরাশক্তি। মিত্রদের সামরিক সহায়তা নিয়ে ২০২০ সাল নাগাদ আলেপ্পোসহ সিরিয়ার মূল শহরগুলোর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পান বাশার আল-আসাদ। তখন থেকে সিরিয়ার সিংহভাগ এলাকায় চলছিল বাশার আল-আসাদের শাসন। তবে দেশটিতে সংঘাত, রক্তপাত পুরোপুরি থেমে থাকেনি।
সিরিয়ায় প্রায় ১৩ বছরের গৃহযুদ্ধে ছয় লাখের বেশি মানুষ নিহত হয়। বাস্তুচ্যুত হয় এক কোটি ৩০ লাখের বেশি মানুষ। গৃহযুদ্ধে ভয়াবহ মানবিক সংকটে পড়ে সিরিয়া। কিন্তু এদিকে সামান্যতম ভ্রুক্ষেপ না করে বাশার আল-আসাদ তাঁর ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে ব্যস্ত থাকেন।
হঠাৎ বিশ্বের নজর সিরিয়া থেকে অন্যত্র সরে যায়। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ শুরু করে রাশিয়া। এই অভিযান শুরুর পর রাশিয়ার সামরিক অগ্রাধিকারে চলে আসে ইউক্রেন যুদ্ধ। এসব বৈশ্বিক ঘটনার ডামাডোলে সিরিয়া ইস্যু হারিয়ে যেতে বসেছিল। তবে নভেম্বর মাসেরই (২০২৪) শেষদিকে সিরিয়ার বিদ্রোহীদের আচমকা ও বিস্ময়কর অগ্রযাত্রার মধ্য দিয়ে আবার বৈশ্বিক নজরের কেন্দ্রে চলে আসে সিরিয়া। ২৭ নভেম্বর সিরিয়ার বিদ্রোহী যোদ্ধারা নতুন করে, নতুন উদ্যমে বাশার আল-আসাদ সরকারবিরোধী অভিযান শুরু করেন। এ অভিযানে নেতৃত্ব দেন বিদ্রোহী গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস)।
বাশার আল-আসাদকে টিকিয়ে রাখতে রাশিয়া নামকাওয়াস্তে বিদ্রোহীদের ওপর বিমান হামলা চালায়। অন্যদিকে আলেপ্পো থেকে বিদ্রোহীদের দামেস্ক যাওয়া ঠেকাতে মধ্যবর্তী হামা শহরে যোদ্ধা পাঠায় হিজবুল্লাহ। কিন্তু এ বিদ্রোহীদের অগ্রযাত্রা থামাতে ব্যর্থ হয়। একই বছরের ৫ ডিসেম্বর হামা দখল করে নেন বিদ্রোহীরা। তারা দুর্বার গতিতে রাজধানী দামেস্কের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। বিদ্রোহীদের হাতে তৃতীয় বৃহত্তম শহর হোমসের পতন হয় ৭ ডিসেম্বর। এরপর দামেস্কের কাছের দেরা ও সুয়েইদা শহরের নিয়ন্ত্রণ হারায় সরকারি বাহিনী। ৭ ডিসেম্বর বাশার আল-আসাদ তাঁর সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকে দেশটির শীর্ষস্থানীয় সেনা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা অংশ নেন। বৈঠকে বাশার আল-আসাদ এ বলে নিশ্চয়তা দেন যে রুশ বাহিনী তাঁকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসবে।
৮ ডিসেম্বর ভোরে রাজধানীতে ঢুকে পড়েন বিদ্রোহী যোদ্ধারা। বিদ্রোহীদের দামেস্ক দখলের মুখে বাশার আল-আসাদ এদিন ভোরে একটি উড়োজাহাজে করে রাজধানী ছাড়েন। দামেস্ক থেকে যান সিরিয়ার উপকূলীয় শহর লাতাকিয়ায়। লাতাকিয়ার রুশ বিমানঘাঁটি থেকে বাশার আল-আসাদকে মস্কোয় উড়িয়ে নেওয়া হয়। তিনি এমনভাবে দেশ ছাড়েন যে তাঁকে বহনকারী উড়োজাহাজটিকে রাডারে শনাক্ত করা পর্যন্ত যায়নি। এরপর বিদ্রোহী যোদ্ধারা ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন, ‘জালিম শাসক বাশার আল-আসাদ পালিয়েছেন। দামেস্ক মুক্ত হয়েছে। সিরিয়া মুক্ত হয়েছে। একটি অন্ধকার যুগের সমাপ্তি হয়েছে। সূচনা হয়েছে এক নতুন যুগের।’ সূত্র : আলজাজিরা, রয়টার্স, এএফপি, বিবিসি


