Homeআন্তর্জাতিকভূমধ্যসাগরে প্রাণ গেল ৯ বাংলাদেশির

ভূমধ্যসাগরে প্রাণ গেল ৯ বাংলাদেশির

ইউরোপে গিয়ে পরিবারের ভাগ্য বদলানোর স্বপ্ন নিয়ে লিবিয়া থেকে ট্রলারে চড়েছিলেন তারা। কিন্তু সেই রঙিন স্বপ্ন মাঝপথেই পরিণত হলো ভয়াল দুঃস্বপ্নে। ভূমধ্যসাগরে ইঞ্জিন বিকল হয়ে টানা ১১ দিন খাবার ও পানি ছাড়া ভাসতে ভাসতে তৃষ্ণা আর ক্ষুধায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন ১১ জন। যাদের ৯ জনই বাংলাদেশি। চোখের সামনে সঙ্গীর এমন ছটফট মৃত্যু দেখেও নিরুপায় ছিলেন বেঁচে থাকা মানুষগুলো। একপর্যায়ে লাশে পচন ধরলে বাধ্য হয়ে সাগরে ফেলে দেন। উদ্ধার হওয়ার পর মিসরে চিকিৎসাধীন এক বাংলাদেশির বর্ণনায় উঠে এসেছে এমনই হাড় হিম করা কাহিনি। এ ঘটনায় সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার ছয় যুবকের এখনো সন্ধান মেলেনি। তাদের ঘরে ঘরে চলছে কান্নার রোল।

মিসরের মারসা মাতরুহ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওই বাংলাদেশির নাম আব্দুল করিম। বাড়ি শান্তিগঞ্জের পাথারিয়া গ্রামে। তিনি বলেন, আমরা ৪২ জন ছিলাম। এর মধ্যে ৩৮ জন বাংলাদেশি। বাকি চারজন সুদানের। ৩ আগস্ট আমরা গ্রিসের উদ্দেশে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় রওয়ানা দিই। গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছার পর নৌকার ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যায়। জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। আমাদের খাবার ও পানি ছিল না। চোখের সামনে ৯ জন বাংলাদেশি মারা যান। তাদের লাশে পচন ধরায় সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে থাকার কারণে আমাদের শরীরেও পচন ধরেছে। আমরা দেশে ফিরতে চাই।

মিসরের কায়রোয় বাংলাদেশ দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি (শ্রম) মো. জাকির হোসেনও এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। আবদুল করিম দূতাবাসকে জানিয়েছেন, তারা প্রায় ১১ দিন সাগরে ভেসে থাকার পর ১৩ আগস্ট মিসরের মারসা মাতরুহ উপকূলে পৌঁছায়। স্থানীয় লোকজন নৌকাটি দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেয়। পরে প্রায় ৩০ জনকে উদ্ধার করে দুটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। উদ্ধার হওয়া অনেকেই তখন অচেতন ছিলেন। তারা বর্তমানে পুলিশের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

আবদুল করিম আরও জানান, নৌকায় খাবার ও পানি না থাকায় এবং প্রচণ্ড গরমের মধ্যে অন্তত ১১ জন মারা যান। তাদের মধ্যে নয়জন বাংলাদেশি ছিলেন। পরে লাশে পচন ধরলে বাধ্য হয়ে লাশগুলো সাগরে ফেলে দেন। তিনি আরও জানান, যে নৌকায় তাদের গ্রিসে নেওয়া হচ্ছিল, সেখানে সর্বোচ্চ ২৫ জন যাত্রী বহনের সক্ষমতা ছিল। তাছাড়া নৌকাটিতে ছিল মাত্র একটি ইঞ্জিন।

দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি মো. জাকির হোসেন বলেন, মিসরের পুলিশ এখনো ভূমধ্যসাগরে মৃত্যুর ঘটনা নিশ্চিত করার মতো কোনো তথ্য পায়নি বলে জানিয়েছে।

শান্তিগঞ্জের ছয়জন নিখোঁজ : সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জের নিখোঁজ ছয় যুবক হলেন-পশ্চিম পাগলার শত্রুমর্দন গ্রামের হৃদয় পাল, পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের চিকারকান্দি গ্রামের এনামুল খাঁন, রিপন মিয়া, মামুন খাঁন, রনসী গ্রামের মো. তালহা ও দরগাপাশার সিচনী গ্রামের সাগর পাল। তাদের পরিবারে চলছে আহাজারি।

হৃদয় পালের বাবা রন্টু পাল বলেন, ৩১ জুলাই সবশেষ হৃদয়ের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয়। এ সময় হৃদয় জানান, ২-১ দিনের মধ্যেই সে লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশে রওয়ানা দেবে। এরপর আর কথা হয়নি। তিনি আরও বলেন, লিবিয়ায় বসবাসরত মানব পাচারকারী চক্রের উমর আলী ও শান্তিগঞ্জের ডুংরিয়া গ্রামের দালাল কদ্দুস আলীর সঙ্গে ১৩ লাখ টাকার চুক্তিতে হৃদয়কে প্রথমে ঢাকা থেকে ভারত পাঠানো হয়। সেখান থেকে শ্রীলংকা ও সংযুক্ত আরব আমিরাত হয়ে লিবিয়া পাঠানো হয়।

অপর নিখোঁজ মামুনের চাচা বলেন, আমার ভাতিজা লিবিয়া থেকে ৩ আগস্ট সাগরপথে গ্রিসে পাড়ি জমায়। ওইদিন আমাদের সঙ্গে ফোনে কথা হয়। এরপর থেকে আর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি, আমার ভাতিজাকে যেন সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে শান্তিগঞ্জ থানার ওসি মো. ওলিউল্লাহ বলেন, এ বিষয়ে ভুক্তভোগী কোনো পরিবারে পক্ষ থেকে কেউ যোগাযোগ করেনি। আমরা নিজে থেকেই এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছি।

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য