Homeআইন আদালতধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার, বন্দি ৯৩ হাজার

কারাগারে উপচে পড়া ভিড়, বিচারে দীর্ঘসূত্রতা
ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার, বন্দি ৯৩ হাজার

ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি বন্দির বোঝা বইতে গিয়ে দেশের কারাগারগুলোতে এক তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সারা দেশে মোট ৭৫টি কারাগারে মাত্র ৪৫ হাজার ২৮৬ জন বন্দি রাখার ব্যবস্থা থাকলেও গত ৩০ জুলাই পর্যন্ত সেখানে ঠাঁই পেয়েছেন ৯৩ হাজার ৪৪০ জন। বিচার প্রক্রিয়ায় অস্বাভাবিক ধীরগতি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক গ্রেপ্তার অভিযান এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন-পরবর্তী মামলার চাপ সামলাতে গিয়ে চরম হিমশিম খাচ্ছে কারা কর্তৃপক্ষ।

পরিসংখ্যান ও ধারণক্ষমতার চিত্র

কারা অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ৩০ জুলাই পর্যন্ত কারাগারগুলোতে অবস্থানরত বন্দিদের মধ্যে ৮৯ হাজার ৯২৯ জন পুরুষ এবং ৩ হাজার ৫১১ জন নারী। উদ্বেগজনক তথ্য হলো, এই বিশাল সংখ্যার মধ্যে সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি মাত্র ৩০ হাজার ৩৮৫ জন। অবশিষ্ট ৬৩ হাজারেরও বেশি বন্দি মূলত বিচারাধীন মামলার সাধারণ হাজতি। এ ছাড়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির সংখ্যা ২ হাজার ৫৮০ জন, যার মধ্যে ৭৬ জন নারী।

কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ৪ হাজার ৫৯০ জনের ধারণক্ষমতার বিপরীতে বাস করছেন ১২ হাজার ৫৯ জন বন্দি। কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১-এ ৫৪৮ জনের জায়গায় ১ হাজার ৭৬৩ জন, কাশিমপুর-২-এ ২ হাজারের জায়গায় প্রায় ৪ হাজার এবং কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে ১ হাজার ধারণক্ষমতার বিপরীতে আটক রয়েছেন প্রায় ৩ হাজার বন্দি। তথ্যমতে, প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৭০০ নতুন বন্দি কারাগারে প্রবেশ করছেন, আর জামিনে বা সাজা খালাস পেয়ে বের হচ্ছেন ২ হাজার ৬৮৭ জন।

অপরাধের ধরন ও কারাবন্দিদের পরিচয়

কারাগারের সিংহভাগ জায়গা দখল করে রয়েছে মাদক মামলার আসামিরা, যার সংখ্যা প্রায় ১৮ হাজার। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট হত্যা মামলায় ৪৬৫ জন ও হত্যাচেষ্টা মামলায় ৩৭১ জন আটক আছেন। পাশাপাশি সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ৪১৪ জন এবং রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় ৬৮ জন বন্দি রয়েছেন। এ ছাড়া ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ৩০ জুলাই পর্যন্ত সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের ৪৫ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, ৭৬ জন এমপি, ৫৩ জন পুলিশ কর্মকর্তা এবং ১৮ জন উচ্চপদস্থ আমলা কারান্তরীণ রয়েছেন।

মৌলিক অধিকার খর্ব ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বন্দি অবস্থানের ফলে চরম মানবিক বিপর্যয় ঘটছে। মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন জানান, অনিয়ন্ত্রিত ভিড়ের কারণে আবাসন, চিকিৎসা, খাদ্য ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সঠিক পরিবেশের অভাবে বন্দিরা চর্মরোগ, পেটের পীড়াসহ নানাবিধ সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। অধিকন্তু, সীমিত জনবল নিয়ে দ্বিগুণ বন্দির দেখভাল ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও কারা প্রশাসনের জন্য দুরূহ হয়ে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞ মতামত ও প্রতিকারের উপায়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, বিচারে তীব্র দীর্ঘসূত্রতা এবং রাজনৈতিক মামলার কারণেই পরিস্থিতির এমন অবনতি হয়েছে। তিনি লঘু অপরাধের বিচার নিষ্পত্তিতে গ্রাম আদালত কিংবা সিটি করপোরেশনকে কাজে লাগানোর তাগিদ দেন।

কারা অধিদপ্তরের সাবেক ডিআইজি (প্রিজন্স) মেজর (অব.) শামসুল হায়দার সিদ্দিকী জানান, কয়েদিরা সাধারণত কারাগারের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও পরিচ্ছন্নতার কাজ করে থাকেন। কিন্তু বর্তমানে কয়েদির তুলনায় হাজতি আসামির সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি অনতিবিলম্বে বিচারাধীন মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জোর দাবি জানান।

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য