Homeজাতীয়জামায়াত এমপি নজরুল বহিষ্কার

তরুণীসহ ভিডিও ভাইরাল
জামায়াত এমপি নজরুল বহিষ্কার

নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ায় সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। গতকাল বুধবার জামায়াতের দেওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। এ অবস্থায় আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অতীতের নজির ও সংশ্লিষ্ট বিধি-বিধান অনুসারে তিনি সংসদ সদস্য পদ হারানোরও ঝুঁকিতে।

এদিকে জামায়াতের এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে গতকাল বুধবার শ্যামনগরে সর্বস্তরের জনগণ গাজী নজরুল ইসলামের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার, এমপি পদ বাতিলসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বিক্ষাভ মিছিল ও সমাবেশ করে। শ্যামনগরে তাঁকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে তাঁর কুশপুত্তলিকা দাহ ও থুতু নিক্ষেপ করা হয়।

এই পরিস্থিতিতে গতকাল বিকেল ৪টায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের এক জরুরি বৈঠকে গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হয়।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সম্প্রতি সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত খবরের বিষয়ে সাংগঠনিক তদন্তে তাঁর নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাঁকে সংগঠন থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনকে অবিলম্বে অবহিত করার সিদ্ধান্ত হয়।

উল্লেখ্য, সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় জামায়াতে ইসলামীর শুরা সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়। প্রথমে গত সোমবার রাতে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে। এরপর মঙ্গলবার দুপুর ১২টা ও দুপুর ১টার দিকে আরো দুটি ভিডিও ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর কয়েকটি অংশে দেখা যায়, অল্পবয়সী এক নারীর সঙ্গে নজরুল ইসলাম একটি কক্ষে অবস্থান করছেন। সেখানে তাঁদের অন্তরঙ্গ অবস্থায় বসে থাকতে দেখা যায়।আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, গাজী নজরুল ইসলাম তাঁর অপরাধ স্বীকার করছেন।

এ নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা যখন তুঙ্গে, তখন এমপি গাজী নজরুল ইসলাম দাবি করেন, ভিডিওতে থাকা তরুণী তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী। তবে একটি বায়োডাটায় দেখা গেছে, দাবি করা বিয়ের পাঁচ দিন পরও ওই তরুণীর বৈবাহিক অবস্থা ‘অবিবাহিত’ লেখা রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে একটি কক্ষে এক তরুণীর সঙ্গে তাঁকে ঘনিষ্ঠভাবে দেখা যায়।

ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেত্রী তাসনিম জারা গতকাল নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে লেখেন, “যথেষ্ট প্রাথমিক প্রমাণ আমাদের সামনে এসেছে। তদন্ত কমিটি হোক, খতিয়ে দেখা হোক। অভিযোগ মিথ্যা হলে মানুষটা কলঙ্কমুক্ত হবেন। আর সত্য হলে, ‘মহান সংসদ’ নামের মর্যাদাটুকু বাঁচাতে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।”

শ্যামনগরে বিক্ষোভ : গাজী নজরুলের বহিষ্কারসহ শাস্তির দাবিতে গতকাল শ্যামনগরে বিক্ষোভ মিছিলসহ প্রতিবাদ সমাবেশ হয়। সকাল ১১টায় শ্যামনগরের সচেতন নাগরিক সমাজের আয়োজনে এই সমাবেশে বক্তারা বলেন, মুখে ইসলামের কথা বলে মানুষের ভোট নিয়ে মানুষের সেবা না করে ঘৃণ্য কাজ করেছেন এমপি গাজী নজরুল ইসলাম। অথচ ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষের কাছ ভোট আদায় করেছেন তিনি। মানুষের সেবার পরিবর্তে বৃদ্ধ বয়সে ঢাকার আবাসিক হোটেলে অল্পবয়সী তরুণীর সঙ্গে অনৈতিক কাজ করতে পারেন—এমন জনপ্রতিনিধি শ্যামনগরের মানুষ আর দেখতে চায় না। আমরা তাঁকে শ্যামনগর উপজেলা থেকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করলাম। সমাবেশে তাঁর এমপি পদ বাতিলের জন্য স্পিকারের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়। এর আগে শিশু-কিশোর ও নারী-পুরুষের সম্মিলিত বিক্ষোভ মিছিল শেষে এমপি গাজী নজরুল ইসলামের কুশপুত্তলিকা দাহসহ তাঁর ছবিতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে থুতু নিক্ষেপ করা হয়।

সমাবেশে বক্তব্য দেন উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সোলায়মান কবির, জেলা বিএনপির সদস্য অ্যাডভোকেট আশেক এলাহী মুন্না, মহিলা দলের সভানেত্রী নুরজাহান পারভীন ঝর্ণা, উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি গাবুরা ইউপি চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম, পদ্মপুকুর ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান আমজাদুল হোসেন, যুবদলের আহ্বায়ক শফিকুল ইসলাম দুলুসহ অন্যরা।

আগের নজির ও আইনে যা বলা আছে : ২০১৪ সালের শেষ দিকে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী নিজ দল আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত হন। এর ফলে তাঁকে সংসদ সদস্য পদও হারাতে হয়। তখন যে দল থেকে তিনি নির্বাচিত সেই দল তাঁকে বহিষ্কার করায় তাঁর সদস্য পদ থাকে কি না এ প্রশ্ন ওঠে।

সে সময় জাতীয় সংসদের স্পিকার সংসদীয় কার্যপ্রণালী বিধির ১৭৮ বিধি অনুসারে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচন কমিশনে পাঠান। ১৭৮ বিধির দফা ১-এ বলা আছে, ‘নির্বাচনের পর কোনো সদস্য সম্বন্ধে যদি এমন বিরোধ দেখা যায় যে, সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের (২) দফায় বর্ণিত অযোগ্যতাগুলোর কোনো একটি কারণে তিনি অযোগ্য বিবেচিত হইবেন কি না, অথবা সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাঁহার আসন শূন্য হইবে কি না, তাহা হইলে স্পিকার উক্ত বিষয়টি নির্বাচন কমিশনে প্রেরণ করিবেন।’ সংসদীয় কার্যপ্রণালী বিধির দফা ২-এ বলা আছে, ‘যদি নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত এই হয় যে, উক্ত সদস্য অযোগ্য হইয়াছেন, অথবা তাঁহার আসন শূন্য করা উচিত, তাহা হইলে তিনি আর সদস্য থাকিবেন না।’

লতিফ সিদ্দিকীর ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন বিষয়টি শুনানির জন্য তাঁকে নোটিশ পাঠালে সে নোটিশের কার্যকারিতা স্থগিত চেয়ে তিনি হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। একই সঙ্গে রিটে ওই নোটিশ কেন অবৈধ ও অকার্যকর ঘোষণা করা হবে না তা জানতে রুলের আরজি জানান। বিচারপতি মো. এমদাদুল হক ও বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রিট আবেদন সরাসরি খারিজ করে দেন। এরপর হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার আদালতে লতিফ সিদ্দিকীর আবেদনও আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে খরিজ হয়ে যায়। সুপ্রিম কোর্ট লতিফ সিদ্দিকীকে নির্বাচন কমিশনে যেতে বলেন। এই পরিস্থিতিতে লতিফ সিদ্দিকী নির্বাচন কমিশনের শুনানিতে হাজির হয়ে বলেন, ‘শুনানির প্রয়োজন নেই। আমি সংসদ থেকে পদত্যাগ করব।’ এরপর ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন।

আবার ভিন্ন নজিরও রয়েছে। সংসদীয় ইতিহাসে দল থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকার নজির রয়েছে। প্রথম নজির অষ্টম জাতীয় সংসদে বিএনপির আবু হেনা। ২০০৫ সালে দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর তৎকালীন স্পিকারের রুলিংয়ে তিনি স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নবম সংসদে জাতীয় পার্টির এইচ এম গোলাম রেজাও বহিষ্কারের পর সদস্য পদ হারাননি। এরপর একাদশ জাতীয় সংসদে গণফোরাম থেকে বহিষ্কৃত সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ ও মোকাব্বির খান বহিষ্কারের পরও সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে দল থেকে বহিষ্কৃত এই সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দল থেকে তাঁদের সদস্য পদ বাতিলের আবেদন করা হয়নি।

এ বিষয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘জামায়াত যদি গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য বাতিল চেয়ে স্পিকারকে চিঠি দেয়, আর স্পিকার যদি বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচন কমিশনে পাঠান, তবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে নির্বাচন কমিশন। তবে কোনো সংসদ সদস্য তাঁর দল থেকে পদত্যাগ না করলে অথবা দলের বিরুদ্ধে সংসদে ভোট না দিলে তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিল হওয়ার স্পষ্ট কোনো বিধান নেই। নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধের বিষয়টিও আদালতে প্রমাণ হতে হবে।’

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ‘বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কিছু জানি না। তবে জাতীয় সংসদের স্পিকার যদি নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেন, তখন নির্বাচন কমিশন আইন অনুসারে ব্যবস্থা নিতে পারে।’

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনির মনে করেন, গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ থাকবে না। গতকাল নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে তিনি লিখেছেন, “সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে আছে ‘পদত্যাগ’। তিনি হয়েছেন ‘বহিষ্কার’। জামায়াত আজকেই নির্বাচন কমিশনকে জানিয়ে দিচ্ছে। কারণ ‘নৈতিক স্খলন’। প্রশ্ন হচ্ছে সংসদ সদস্য থাকতে পারবেন কি না? আমার মতে না।”

নজরুলসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে ঢাকায় মামলা : এদিকে এমপি গাজী নজরুল ইসলামসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে রাজধানীর পল্লবী থানায় মামলা হয়েছে। অনৈতিক সম্পর্কের প্রতিবাদ এবং ভিডিও ফাঁসের সন্দেহে মারধর ও শ্বাসরোধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এনে গাড়িচালক ওবায়দুর রহমান তাঁদের বিরুদ্ধে গত মঙ্গলবার বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা করেন। মামলা দায়েরের পর আমিনুর রহমান নামের এক আসামিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

গতকাল মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পল্লবী জোনাল টিমের এসআই রাকিবুল হুদা তাঁকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কামাল উদ্দীন তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। আগামী ২৪ আগস্টের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই সাইফুল ইসলাম এসব তথ্য জানান। মামলার অন্য আসামিরা হলেন—মাসুম বিল্লাহ (৪১), মোতাসসিম বিল্লাহ (২৫) ও রাকিবুল হাসান (৩০)।

মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, ওবায়দুর রহমান পল্লবীর কালশী এলাকার ‘রোজগার্ডেন টাওয়ার’-এ তাঁর বোনের বাসায় বসবাস করতেন। তিনি গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত গাড়িচালক ছিলেন। আত্মীয়তার সূত্রে নজরুল ইসলাম ওই বাসায় যাতায়াত করতেন। এক পর্যায়ে নজরুল ইসলামের সঙ্গে ওবায়দুরের ভাগ্নির অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিষয়টি টের পেয়ে ওবায়দুর তাঁর পরিবারকে জানান এবং নজরুল ইসলামকে এ ধরনের সম্পর্ক থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে নজরুল ইসলাম তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেন।

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য