Homeঅর্থনীতি৩য় এলএনজি টার্মিনাল দিতে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে তোড়জোড়

প্রতিদিন ৩৫ থেকে ৩৭ শতাংশ বেশি ভাড়া নির্ধারণ
৩য় এলএনজি টার্মিনাল দিতে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে তোড়জোড়

কোনো ধরনের প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই দেশের তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপনের কাজ চীনা একটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার তোড়জোড় চলছে। ‘চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড’ (সিএনইই) নামের এই সংস্থার প্রস্তাব অনুমোদন করতে জিটুজি (সরকার থেকে সরকার) পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চমকে ওঠার মতো তথ্য—সিএনইইর জমা দেওয়া অর্থনৈতিক ও কারিগরি প্রস্তাবের সিংহভাগই অন্য একটি বেসরকারি কোম্পানির নথি থেকে হুবহু ‘কপি-পেস্ট’ করা। এমনকি জালিয়াতির স্পষ্ট প্রমাণ রেখে চীনা কোম্পানির নথির মানচিত্রে অন্য কোম্পানির নামও রেখে দেওয়া হয়েছে।

নথিপত্র জালিয়াতির পাশাপাশি বড় ধরনের অর্থজালিয়াতি ও রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে সিএনইইর প্রস্তাবিত ভাড়ার অঙ্কে। বর্তমানে দেশে চালু থাকা দুটি এফএসআরইউর তুলনায় এই প্রকল্পে দৈনিক ৩৫ থেকে ৩৭ শতাংশ অতিরিক্ত ভাড়া হাঁকা হয়েছে। প্রতিদিন ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলার ভাড়ার এই চুক্তি কার্যকর হলে ১৫ বছরে দেশের কোষাগার থেকে অতিরিক্ত গচ্চা যাবে প্রায় ২ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা (২৩ কোটি ডলার)

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সিএনইইর ওয়েবসাইটে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) নির্মাণের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতাই তাদের নেই। অভিজ্ঞতাহীন একটি সংস্থাকে ১৮ মাসের মধ্যে প্রকল্প চালুর অলৌকিক প্রতিশ্রুতিতে কাজ দেওয়ার তোড়জোড় চলছে, যা বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত ২৮ জুলাই অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি রহস্যজনকভাবে সিএনইইর প্রস্তাবটি প্রক্রিয়াকরণের নীতিগত অনুমোদন দেয়। এর আগে ১২ মে ‘এনএস এনার্জি নেভিগেশন’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান এই টার্মিনাল স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছিল, যার নেপথ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাবেক এক সংসদ সদস্যের স্বজন যুক্ত বলে জানা গেছে। এনএস এনার্জির প্রস্তাব জমা দেওয়ার ঠিক এক মাস পর ১৯ জুন সিএনইই তাদের প্রস্তাব জমা দেয়।

দুটি নথির তুলনা করে দেখা যায়, প্রচ্ছদ ও সই ছাড়া বাকি পুরো প্রস্তাবে কারিগরি সক্ষমতা, মহেশখালীর কুতুবজোমের অবস্থান, সাবসি পাইপলাইন, ২০ বছরের বিওও মডেল এবং বাস্তবায়নের সময়সূচীর প্রতিটি শব্দ ও ভাষা হুবহু এক। এমনকি সিএনইই তাদের নিজস্ব নথি হিসেবে যে নকশা জমা দিয়েছে, তাতে এনএস এনার্জির নাম স্পষ্ট ভেসে উঠছে।

এদিকে সরকারের নিজস্ব সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে যেখানে দৈনিক ভাড়া ধরা হয়েছিল ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬৫৩ ডলার, সেখানে সিএনইই চেয়েছে ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলার—যা সরকারের হিসাবের চেয়েও প্রায় ৪৩ শতাংশ বেশি। বর্তমানে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি ২ লাখ ৫৪ হাজার ডলার এবং সামিট গ্রুপ ২ লাখ ৪৯ হাজার ১১৫ ডলারে এলএনজি টার্মিনাল পরিচালনা করছে। পূর্বে সামিটের সঙ্গে বাতিল হওয়া চুক্তির চেয়েও এই চীনা কোম্পানির পক্ষে প্রতিদিন ৪২ হাজার ডলারের এই অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা তৈরি করা হচ্ছে। সাত সদস্যের সম্ভাব্যতা যাচাই কমিটি প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করলেও এই উচ্চ ভাড়া কতটা যৌক্তিক, তা স্পষ্ট করতে পারেনি।

কেন এত অস্বাভাবিক ভাড়া—এমন প্রশ্নে বৈশ্বিক বাজারদর, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ও নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধির দোহাই দিয়েছে সিএনইই। তবে প্রতিযোগিতাহীনভাবে এই বিপুল অঙ্কের জনগণের টাকা লুটপাটের আড়ালে থাকা অর্থজালিয়াতির বিষয়ে জবাব মিলেনি খোদ জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, জ্বালানি সচিব জিয়াউল হক এবং পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা ফোন ধরেননি এবং বার্তারও কোনো জবাব দেননি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম প্রথম আলোকে বলেন, “কোনো উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই কেন আগের দুটি চলমান টার্মিনালের চেয়ে এত বেশি ভাড়ায় চুক্তি করতে হবে, তার কোনো যৌক্তিক জবাব নেই। এটি স্পষ্টত অস্বচ্ছ। এছাড়া সিএনইইর এই খাতে কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই, তাদের আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা এবং ভূভৌগোলিক সমীক্ষা ছাড়া ১৮ মাসের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার প্রতিশ্রুতি ভিত্তিহীন। অবিলম্বে স্বাধীন তৃতীয় পক্ষ বা বিশেষজ্ঞ দিয়ে এই ব্যয়ের কাঠামো পুনর্মূল্যায়ন এবং প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান করা উচিত।”

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য