জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, ঢাকা আলিয়া মাদরাসা ও বরিশাল সরকারি বিএম কলেজে সংঘর্ষ, শতাধিক আহত
দেশের পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এসব সংঘর্ষে দুই পক্ষের শতাধিক আহত হয়। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। এসব সংঘর্ষে লাঠিসোঁটা ও ধারালো অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং প্রশাসন অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে। গত সোমবার রাতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
এরপর গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, ঢাকা আলিয়া মাদরাসা ও বরিশাল সরকারি বিএম কলেজে সংঘর্ষে জড়ান ছাত্রদল ও শিবিরের নেতাকর্মীরা। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জুলাই অভ্যুত্থান’ উপলক্ষে ছাত্রশিবির আয়োজিত এক আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত জামায়াত নেতাদের ছবি প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হয়ে রাত প্রায় ১টা পর্যন্ত চলে এই উত্তেজনা। প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইট-পাটকেলে অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন বলে জানা যায়। এ ঘটনায় ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মো. ফেরদৌস রহমান স্বাক্ষরিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত ক্যাম্পাসে বহিরাগত দর্শনার্থী এবং সব ধরনের যানবাহন প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সংঘর্ষের ঘটনায় ‘ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে’ জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সংঘর্ষ ও ‘অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি’ তদন্তে কমিটি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) স্বাক্ষরিত এক আদেশে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়েছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষে আহত ৫০ : প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনের এক অনুষ্ঠানে পৌঁছার পর সংঘর্ষের শুরু হয়। দুপুর ২টায় ক্যাম্পাসের অদূরে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে জড়ো হন ছাত্রশিবিরের বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীরা। হাসপাতালের মূল ফটকের বাইরে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা জড়ো হয়ে স্লোগান দিতে থাকেন। এক পর্যায়ে ছাত্রশিবির নেতাকর্মীরা ধাওয়া করতে গেলে পাল্টা ধাওয়া দেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এ সময় দুই পক্ষ একে অন্যের দিকে ইট-পাটকেল ছোড়ে। অনেকের হাতে দেশীয় অস্ত্রও দেখা গেছে। সংঘর্ষে অন্তত ৫০ জন আহত হন। হাসপাতালের সামনে ও ভেতরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। হাসপাতালে সংঘর্ষের সময় রোগী এবং তাদের স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ায়।
ঢাকা কলেজে আহত ২৫ : ঢাকা কলেজে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে ক্যাম্পাসজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। দুপুর ২টার দিকে এই ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সংঘর্ষের পর কলেজের প্রধান ফটকে অবস্থান নেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ২৫ জন আহত হন। ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, পুলিশ ক্যাম্পাসে গেছে।
ঢাকা আলিয়া মাদরাসায় আহত ২০ : জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষের পর রাজধানীর বকশীবাজারে সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়ার (আলিয়া মাদরাসা) সামনে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়। দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত থেমে থেকে আলিয়া মাদরাসার সামনের সড়কে দুই পক্ষে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, ইট-পাটকেল নিক্ষেপ ও মারধরের ঘটনায় অন্তত ২০ জন আহত হয়। আলিয়া মাদরাসার অধ্যক্ষ মাহমুদ ওবায়দুল হক (৫২), ঢাকা দক্ষিণ ছাত্রদলের সভাপতি শামীম মাহমুদ (৩০), সরকারি আলিয়া মাদরাসা ছাত্রশিবিরের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সানাউল্লাহ (৩০) এবং লালবাগ থানা ছাত্রদলের সদস্যসচিব নিছার উদ্দিন রাব্বিকে (২৭) বিকেলে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। ঢামেক পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক বলেন, জরুরি বিভাগে চারজনের চিকিৎসা চলছে।
বরিশাল সরকারি বিএম কলেজে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া : বরিশাল সরকারি বিএম কলেজে গতকাল বিকেলে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি আল মামুন উল ইসলাম বলেন, ক্যাম্পাসে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী অবস্থান নিয়েছে। বিএম কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি পদপ্রত্যাশী আকবর মুবিন বলেন, ‘গতকাল বিকেল ৫টায় ছাত্রশিবির ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করে। কলেজের ছাত্রাবাস ও ক্যাম্পাস থেকে তাদের বের করে দেওয়া হয়।’ শিবিরের কর্মী আশরাফুল ইসলাম, আরিফুর রহমান, আবির শিকদার ও আমিরুল ইসলাম দাবি করেন, ছাত্রদল হঠাৎ করেই ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে তাঁদের ক্যাম্পাস ও ছাত্রাবাস থেকে বের করে দেয়। বিএম কলেজ মহাত্মা অশ্বিনী কুমার হল সুপার ও কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আসাদুজ্জামান বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে কলেজ অধ্যক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছি।’


