Homeজাতীয়হামে ৮৯% পরিবারে ঋণের বোঝা

হামে ৮৯% পরিবারে ঋণের বোঝা

দেশে হামে আক্রান্ত প্রতি ১০টি পরিবারের প্রায় ৯টি, অর্থাৎ ৮৯ শতাংশ পরিবার চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে ঋণ নিয়েছে। একই সঙ্গে ৬১ শতাংশ পরিবার তাদের জীবনের সব সঞ্চয় শেষ করে ফেলেছে। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (বিডিআরসিএস) ও ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির (আইএফআরসি) পরিচালিত এক যৌথ জরিপে উঠে এসেছে এই উদ্বেগজনক বাস্তবতা। গতকাল সোমবার এই জরিপ বিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

দেশে হামের ভয়াবহতা এখন আর শুধু হাসপাতালে সীমাবদ্ধ নেই, হাজারো পরিবারের অর্থনীতিতে থাবা বসিয়েছে। সন্তানের প্রাণ রক্ষায় চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে বেশির ভাগ পরিবার ঋণের ফাঁদে আটকা পড়ছে। অনেকের সঞ্চয় শেষ, কেউ বিক্রি করছেন সম্পদ, আবার কেউ হাসপাতালের বারান্দায় বসেই স্বজনদের কাছে হাত পাতছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য বলছে, গত এক দিনেই হামে আরো তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে ৯৬৭ জন এবং পরীক্ষায় ১১৩ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে। চলতি বছরের ১৫ মার্চ দেশে প্রথম হাম শনাক্ত হওয়ার পর থেকে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ১৬ হাজার ৪০৮ জনের। উপসর্গ দেখা দিয়েছে এক লাখ ৩১ হাজার ৪৪ জনের। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যেতে হয়েছে এক লাখ ১৩ হাজার ৫২২ জনকে। নিশ্চিত হামে মারা গেছে ৯৬ শিশু। উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে আরো ৭৫১ শিশুর।সব মিলিয়ে প্রাণহানি ৮৪৭ জনের।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো টিকাদান নিশ্চিত করার পাশাপাশি আক্রান্ত দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য জরুরি চিকিৎসা সহায়তা, যাতায়াত ব্যয় এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ না করলে হামের স্বাস্থ্য সংকটের সঙ্গে একটি গভীর অর্থনৈতিক সংকটও দীর্ঘস্থায়ী হবে। কারণ এই প্রাদুর্ভাবে শুধু শিশুর জীবনই নয়, হাজারো পরিবারের আর্থিক ভিত্তিও ভেঙে পড়ছে।

সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে জরুরি নগদ সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যে দেশের ১২টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দুই হাজার ৭৪৬টি পরিবারের ওপর জরিপটি চালানো হয়। নির্ধারিত ঝুঁকির সূচক অনুযায়ী এর মধ্যে দুই হাজার ৪০০ পরিবারকে সহায়তার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে।

জরিপ বলছে, সংকট শুধু ঋণেই থেমে নেই। ৪ শতাংশ পরিবার চিকিৎসার খরচ চালাতে সম্পদ বিক্রি করেছে, প্রায় ৩ শতাংশ পরিবার অনুদানের ওপর নির্ভর করেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, জরিপে অংশ নেওয়া শতভাগ পরিবারই জানিয়েছে, তাদের জরুরি আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন।

সহায়তার চাহিদার তালিকায় সবার ওপরে রয়েছে ওষুধ। ৩৫ শতাংশ পরিবার এটিকে সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন হিসেবে উল্লেখ করেছে। ৩৩ শতাংশ পরিবার নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) সহায়তা এবং ২২ শতাংশ  পরিবার খাদ্য সহায়তা চেয়েছে। জরিপে দেখা গেছে, চিকিৎসা ও সংশ্লিষ্ট খাতে প্রতিটি পরিবারকে গড়ে প্রায় ১৬ হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। অথচ অংশগ্রহণকারী পরিবারগুলোর ৭৮ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, যাদের বেশির ভাগের মাসিক আয় মাত্র ছয় হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে। ফলে হাসপাতালে দীর্ঘদিন থাকতে গিয়ে তাঁদের আয় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, কেউ কেউ চাকরিও হারাচ্ছেন। সংক্রমণের সবচেয়ে বড় শিকার ছোট শিশুরা। জরিপ অনুযায়ী, আক্রান্তদের ৭৫ শতাংশের বয়স চার বছরের নিচে। পাঁচ থেকে ১৭ বছর বয়সী ১৯ শতাংশ এবং ১৮ বছরের বেশি মাত্র ৬ শতাংশ।

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সেক্রেটারি জেনারেল ড. কবির এম আশরাফ আলম এনডিসি বলেন, এই মূল্যায়ন দেখাচ্ছে যে বহু পরিবার একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসংকট ও আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। তাই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে নগদ সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি সচেতনতামূলক কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে। বাংলাদেশে আইএফআরসির হেড অব ডেলিগেশন আলবার্তো বোকানেগ্রা বলেন, হামের প্রভাব শুধু হাসপাতালে সীমাবদ্ধ নেই, এটি পুরো পরিবারের জীবিকা ও অর্থনীতিকে নড়িয়ে দিচ্ছে। তাই চিকিৎসার পাশাপাশি মানবিক সহায়তা এবং কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাও জরুরি।

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য