Homeজাতীয়গ্যাসসংকটে বন্ধ হচ্ছে কারখানা

গ্যাসসংকটে বন্ধ হচ্ছে কারখানা

মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে দেশে তীব্র আকার ধারণ করেছে গ্যাসসংকট। জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় তীব্র প্রভাব পড়েছে শিল্প খাতে। সংকটের ভয়াবহতায় ইতোমধ্যেই দেশের অন্তত ৪০ শতাংশ শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং আরও অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাসের চাপ কম থাকলেও গত এক সপ্তাহ ধরে তা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ফলে সক্ষমতার অর্ধেকও উৎপাদন চালানো সম্ভব হচ্ছে না। সময়মতো রপ্তানি আদেশ পাঠানো নিয়ে চরম উদ্বেগে পড়েছেন তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল ও স্টিল খাতের উদ্যোক্তারা।

সরবরাহে ১৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২,২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ প্রতিদিন ঘাটতি থাকছে প্রায় ১,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে আমদানীকৃত এলএনজি থেকে দৈনিক ৯৫০ থেকে ১,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেলেও টার্মিনাল বিকল হওয়ায় তা নেমে এসেছে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটে।

বিদেশি বিশেষজ্ঞ দল ত্রুটি মেরামতের কাজ করলেও কত দিনে সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা জানাতে পারেনি পেট্রোবাংলা। এর ওপর গত ছয় বছরে দেশীয় কূপগুলো থেকে উৎপাদন প্রতিদিন প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে মাত্র ১,৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটে ঠেকেছে।

শিল্প মালিকদের ক্ষোভ ও বিপর্যয়ের শঙ্কা

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল জানান, আগের সরকার শিল্পে গ্যাস কমিয়ে সার উৎপাদনে গুরুত্ব দিয়েছিল, আর বর্তমান সরকারও আবাসিক ও বিদ্যুৎ খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ফলে শিল্প খাত বারবার উপেক্ষিত হচ্ছে। গ্যাসসংকটে তাঁর নিজের শিল্পগ্রুপের টেক্সটাইল, কাগজ ও বোর্ডসহ প্রায় ৯০ শতাংশ কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছে।

একই অবস্থা স্টিল ও সিরামিক খাতেও। বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শেখ মাসাদুল আলম মাসুদ জানান, গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে স্টিল মিলগুলোর উৎপাদন কার্যত বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে, বিসিএমইএ সভাপতি মইনুল ইসলাম জানান, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জ শিল্পবেল্টে চরম সংকটে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।

আশুলিয়া ও নরসিংদীতে গ্যাসের চাপ শূন্যের কাছাকাছি

তিতাস গ্যাসের অপারেশন ডিভিশন জানিয়েছে, নরসিংদী ও আশুলিয়াসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। যেখানে ডিআরএসের বাইরে ৭০ থেকে ৮০ পিএসআই চাপ থাকার কথা, সেখানে মিলছে মাত্র ২০ থেকে ২৫ পিএসআই। গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কমে গেছে। সাভার-আশুলিয়ায় অনুমোদিত ১৫ পিএসআইয়ের জায়গায় মিলছে মাত্র ২ থেকে ৩ পিএসআই। দেশের মোট বস্ত্র চাহিদার ৭০ শতাংশ যোগান দেওয়া নরসিংদীর সাড়ে তিন শতাধিক কারখানা ডায়িং ও ফিনিশিং ইউনিট বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে।

এ ছাড়া বিদ্যুৎ খাতেও সরবরাহ ১,০০০ মিলিয়ন থেকে কমিয়ে ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটে আনা হয়েছে। পরিবহন খাতেও এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে; সিএনজি স্টেশনগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়েও পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছে না যানবাহনগুলো।

বিশেষজ্ঞদের মত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম সতর্ক করে বলেছেন, দেশে কোনো অতিরিক্ত রিজার্ভ বা ব্যাকআপ ব্যবস্থা না থাকায় একটি টার্মিনাল বন্ধ হতেই পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা ধসে পড়েছে। এমনকি সামনে বিবিয়ানার মতো বড় কোনো কূপ বিকল হলে এর চেয়েও বড় বিপর্যয় ঘটতে পারে।

পরিস্থিতি মোকাবেলায় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, আমদানিনির্ভরতা কমাতে সরকার ১০০টি নতুন গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সম্প্রতি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে নতুন কূপ খননের প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে তাৎক্ষণিক সমাধান না এলে দেশের বিনিয়োগ, রপ্তানি ও সার্বিক প্রবৃদ্ধিতে মারাত্মক ধস নামবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন অর্থনীতিবিদ ও শিল্প উদ্যোক্তারা।

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য