Homeজাতীয়ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে বালু নদের অববাহিকায় গড়ে ওঠা অবকাঠামো

রাজউকের গবেষণা
ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে বালু নদের অববাহিকায় গড়ে ওঠা অবকাঠামো

রাজধানী ঢাকায় নিরাপদ নির্মাণমান নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিসংবেদনশীল ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা প্রণয়নের লক্ষ্যে রাজউকের ‘আর্বান রেজিলিয়েন্স প্রকল্প’ (ইউআরপি)-এর মাটির গুণগত মান পরীক্ষায় উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বালু নদের অববাহিকার প্রায় ১২০ বর্গকিলোমিটার এলাকা ভূমিকম্পের চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।

অতীতে প্রাকৃতিক জলাভূমি ও জলাশয় ভরাট করে গড়ে ওঠা এসব আবাসিক এলাকা ও মেগা অবকাঠামোর মাটি অত্যন্ত দুর্বল। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ভূপৃষ্ঠের খুব কাছাকাছি অবস্থান করায় মাঝারি থেকে তীব্র ভূমিকম্পে এসব অবকাঠামো দ্রুত ধসে পড়ার বা মাটিতে ডেবে যাওয়ার গুরুতর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

মাটির নমুনা পরীক্ষা ও ঝুঁকির ভয়াবহতা

ইউআরপি প্রকল্পের আওতায় ঢাকা মহানগরীর চার শতাধিক স্থান থেকে মাটির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা চালায় রাজউক। পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, ঢাকার পুরনো ও মূল ভূমির তুলনায় সম্প্রসারিত নিচু এলাকাগুলোতে ভূমিকম্পের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে বালু নদের অববাহিকার মাটির অবস্থা আশঙ্কাজনক।

ইউআরপি প্রকল্পের পরিচালক ও রাজউকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ড. আবদুল লতিফ হেলালী জানান, বনশ্রী থেকে শুরু করে আফতাবনগর, মাদানি এভিনিউ, বসুন্ধরা এবং ৩০০ ফুট সড়ক ধরে আবদুল্লাহপুর পর্যন্ত বিস্তৃত পুরো এলাকাটিই ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে পুরোপুরি ধসে পড়তে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, বালু ভরাট করে গড়ে ওঠা এসব এলাকা মূলত পানির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। গত বছরের ৫.৪ মাত্রার ভূমিকম্পে তেমন ক্ষতি না হলেও, ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে পুরো এলাকা মাটির সাথে মিশে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

‘অ্যামপ্লিফিকেশন’ ও ‘লিকুইফ্যাকশন’ ঝুঁকি

প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের চেয়ারম্যান এবং বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারীর ২০২৪ সালে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুযায়ী, ভূমির গঠনগত দুর্বলতার কারণে এই এলাকায় দুই ধরনের ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি হতে পারে-

অ্যামপ্লিফিকেশন: ভূগর্ভে আলগা বালি ও নরম কাদামাটি থাকার কারণে ভূমিকম্পের কম্পনের তীব্রতা কয়েক গুণ বেড়ে অনুভূত হবে।

লিকুইফ্যাকশন: ভূমিকম্পের ঝাকুনিতে ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি থাকা পানি ও বালি মিশে মাটির ভার বহনের ক্ষমতা পুরোপুরি নষ্ট করে ফেলবে, যার ফলে ভবন আস্ত মাটিতে ডেবে যাবে বা হেলে পড়বে।

অধ্যাপক আনসারী জানান, বালু নদের অববাহিকায় প্রায় সাত মিটার পর্যন্ত আলগা বালি এবং তার নিচে অন্তত ৩৫ মিটার পর্যন্ত নরম কাদামাটি রয়েছে। ফলে ভূমিকম্প হলে এই এলাকায় অ্যামপ্লিফিকেশন ও লিকুইফ্যাকশন দুটোই ঘটবে।

সংরক্ষিত জলাধার ভরাট ও ড্যাপের শঙ্কা

১৯৯৫ সালের ২০ বছর মেয়াদি ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যানে (ডিএমডিপি) বালু নদের অববাহিকার ১২০ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে সংরক্ষিত জলাধার হিসেবে রাখার জোর সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেসব এলাকা ভরাট করেই অনিয়ন্ত্রিত আবাসন গড়ে তোলা হয়।

সর্বশেষ বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনাতেও (ড্যাপ ২০২২-৩৫) এই অঞ্চলটিকে মানচিত্রের মাধ্যমে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট করে আবাসন গড়ে তোলার খেসারত দিতে হচ্ছে। এই এলাকায় বিশেষ নকশার গভীর ফাউন্ডেশন ছাড়া ভবন নির্মাণ মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।

পুরনো বনাম নতুন ঢাকা: ভূতাত্ত্বিক পার্থক্য

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের এক গবেষণায় দেখা যায়, সদরঘাট থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বিস্তৃত প্লাইস্টোসিন যুগের শক্ত লাল মাটির ওপর গড়ে ওঠা পুরান ঢাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বিমানবন্দর ও সাভার এলাকা ভূতাত্ত্বিকভাবে শক্তিশালী। এখানে ৫ থেকে ১০ তলা ভবনের জন্য গভীর পাইলিং আবশ্যক নাও হতে পারে।

অপরদিকে, কেরানীগঞ্জ, হেমায়েতপুর ও বালু নদের অববাহিকা হলো সাম্প্রতিক প্লাবন সমভূমি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. জিল্লুর রহমান জানান, এসব সম্প্রসারিত এলাকায় ৩০ থেকে ৪০ মিটার গভীর প্রকৌশলগত পাইলিং করা হলেও ভূমিকম্পের ঝাঁকুনিতে ভূমি দেবে গিয়ে ভবনের ভিত উন্মুক্ত হয়ে যেতে পারে কিংবা আস্ত ভবন কাত হয়ে পড়তে পারে।

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য