- কুশিয়ারা ও সোমেশ্বরী এখনো বিপৎসীমার ওপরে
- সাঙ্গু, মাতামুহুরী, আত্রাই, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি আরো বাড়তে পারে
- চার বিভাগে ভারি বৃষ্টির আভাস
দেশের অভ্যন্তরে ও উজানে ভারি বৃষ্টির প্রভাবে উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৯ জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। কয়েকটি নদ-নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিয়েছে, প্লাবিত হয়েছে নিম্নাঞ্চল। এদিকে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশের চার বিভাগে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বিশেষ বার্তায় বলা হয়েছে, তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। কুশিয়ারা ও সোমেশ্বরী নদীর পানি কিছুটা কমলেও এখনো বিপৎসীমার ওপরে রয়েছে। ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে কুশিয়ারা বিপৎসীমার ৩৪ সেন্টিমিটার এবং কলমাকান্দা পয়েন্টে সোমেশ্বরী ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি আরো বাড়তে পারে। আত্রাই, ছোট যমুনা এবং ব্রহ্মপুত্র-যমুনার কয়েকটি পয়েন্ট সতর্কসীমায় পৌঁছতে পারে। এতে নওগাঁ, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, জামালপুর, বগুড়া ও টাঙ্গাইলের কোথাও কোথাও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সর্দার উদয় রায়হান বলেন, উজানে ভারি বৃষ্টির কারণে উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদ-নদীর পানি বেড়েছে। বৃষ্টি কমে এলে আজ বুধবার পানি স্থিতিশীল থাকবে। এরপর পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের বেশির ভাগ জায়গায় এবং রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি হতে পারে। বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারি থেকে ভারি বর্ষণের আশঙ্কা রয়েছে।এতে দিনের তাপমাত্রা কিছুটা কমতে পারে। আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক বলেন, চার বিভাগে বিক্ষিপ্তভাবে মাঝারি ধরনের ভারি বৃষ্টি হতে পারে। আগামী কয়েক দিনে বৃষ্টিপাত আরো কমতে পারে এবং সারা দেশে তাপমাত্রা বাড়তে পারে।
কুড়িগ্রামে আবারও বাঁধে ধস : কুড়িগ্রামের চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্র নদের ডান তীররক্ষা বাঁধে আবারও ধস দেখা দিয়েছে। সোমবার সন্ধ্যায় রানীগঞ্জ ইউনিয়নের কাঁচকোল এলাকার সড়কটারী অংশে প্রায় ৩০ মিটার ব্লক পিচিং নদীতে ধসে পড়ে। পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে উঠলে স্থানীয় বাসিন্দারা মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে লোকজন জড়ো করে। পরে রাতেই বস্তা ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করা হয়। গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জিও ব্যাগ ডাম্পিং শুরু করে। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, ব্রহ্মপুত্রের পূর্ব তীরে নতুন চর জেগে ওঠায় স্রোতের চাপ পশ্চিম তীরে বেড়েছে। এরই মধ্যে ২৪ হাজার জিও ব্যাগ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ১৪ হাজার ডাম্পিং সম্পন্ন হয়েছে। স্থায়ী সমাধানের জন্য নতুন প্রকল্প প্রস্তাব করা হবে।
মনপুরায় বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি : ভোলার চরফ্যাশন এবং বিচ্ছিন্ন দ্বীপ মনপুরায় মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর পানি বাড়ছে। প্রবল স্রোতে মনপুরার পুরনো বেড়িবাঁধের একটি অংশ ভেঙে গুচ্ছগ্রামসহ আশপাশের এলাকায় পানি ঢুকেছে। এতে বসতঘর, চলাচলের পথ ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। চরফ্যাশন পাউবো ডিভিশন-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আসরাফুদ দৌলা বলেন, গুচ্ছগ্রামটি মূল বেড়িবাঁধের বাইরে হলেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শেরপুরে পানি নামলেও প্লাবিত হচ্ছে নতুন এলাকা : শেরপুরে পাহাড়ি নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। তবে ভাটির দিকে ঢলের পানি নামতে থাকায় ঝিনাইগাতী, শেরপুর সদর ও নালিতাবাড়ীর নতুন নতুন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। তাতে আড়াই শতাধিক পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। জেলা প্রশাসন শুকনা খাবার বিতরণ শুরু করেছে। নালিতাবাড়ীর চেল্লাখালী নদীর ওপর ভেঙে যাওয়া বেইলি সেতুর কারণে প্রায় ১৫ হাজার মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল মালেক বলেন, পানি কমলে সেতু সংস্কার বা বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আপাতত নৌকার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
লালমনিরহাটে কমছে তিস্তার পানি : ভারতের জলপাইগুড়ি ও সিকিমে ভারি বৃষ্টির কারণে তিস্তার পানি সোমবার সতর্কসীমার কাছাকাছি পৌঁছলেও গতকাল থেকে তা কমতে শুরু করেছে। গতকাল সন্ধ্যায় ডালিয়া পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার ২৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয় বলে জানিয়েছে পাউবো।
কাজিপুরে যমুনার ভাঙনে আতঙ্ক : সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার চরগিরিশ ইউনিয়নে যমুনার ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, গত এক মাসে ২০০ থেকে ৩০০ বসতঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ঝুঁকিতে রয়েছে বিদ্যালয়, মসজিদ, মাদরাসা ও বাজার। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, ভাঙন ঠেকাতে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। তবে স্থায়ী সমাধানে বড় প্রকল্প প্রয়োজন।
সুনামগঞ্জে উন্নতি বন্যা পরিস্থিতির : মেঘালয়ে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। সুরমা নদীর পানি ছাতক ও সুনামগঞ্জ পয়েন্টে কমেছে। কুশিয়ারাসহ অন্যান্য নদ-নদীর পানিও নিম্নমুখী বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইমদাদুল হক বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত না হওয়ায় নদ-নদীর পানি কমছে।
নেত্রকোনায় কমছে উপদাখালীর পানি : নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার উপদাখালী নদীর পানি কমতে শুরু করলেও এখনো বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সীমান্তবর্তী কয়েকটি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা রয়েছে। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, পানি কমলেও নদী এখনো বিপৎসীমার ওপর রয়েছে। তবে লোকালয় থেকে পানি নেমে যেতে শুরু করেছে।


