ইউনুসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টারা মাত্র আঠারো মাসের এক সংক্ষিপ্ত মেয়াদে (শর্ট ইনিংস) দায়িত্ব পালনকালে নিজেদের চিকিৎসা খরচের নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তাদের চিকিৎসা ব্যায়ের হিসাব দেখে রীতিমতো চোখ কপালে ওঠার দশা। যে উপদেষ্টারা দেশের স্বাস্থ্য খাতকে টেনে তোলার ও আমূল সংস্কারের গুরুদায়িত্ব নিয়েছিলেন, ক্ষমতার চেয়ারে বসে তারা চরম অনৈতিকতার প্রকাশ ঘটিয়েছে। দেশের সাধারণ মানুষ যেখানে হাসপাতালের বারান্দায় ও মেঝেতে চিকিৎসার ন্যূনতম সুযোগ না পেয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরছে, সেখানে জনগণের টাকায় থাইল্যান্ড আর সিঙ্গাপুরে কোটি কোটি টাকার এই প্রমোদ চিকিৎসা সাধারণ মানুষের সাথে এক চরম তামাশা ও প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সব নৈতিকতার প্রশ্নকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একক ব্যক্তি হিসেবে সবচেয়ে বড় অঙ্কের টাকা সাবাড় করেছেন সাবেক ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নিখুঁত হিসাব বলছে, তিনি একাই রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে তুলে নিয়েছেন ৮১ লাখ ৯১ হাজার ৪৮৮ টাকা।
হেফাজতে ইসলামের সাবেক এই নায়েবে আমির নিজের হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য পাড়ি জমান থাইল্যান্ডে। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট তাকে সার্টিফিকেট দিয়েছিল যে দেশের মাটিতে তার এই চিকিৎসার ঝুঁকি রয়েছে। চিকিৎসকদের এই খোঁড়া পরামর্শকে ঢাল বানিয়ে খালিদ হোসেন গত বছরের শেষ এবং চলতি বছরের শুরুতে দফায় দফায় থাইল্যান্ডে ছোটেন। প্রথমবার তার এই সরকারি খরচের সফরে যুক্ত ছিলেন একজন ব্যক্তিগত চিকিৎসক, আর পরের দফায় তার সাথে এই রাজকীয় সফরে সঙ্গী হন নিজের মেয়ে ও জামাতা। রাষ্ট্রীয় তহবিলের এতগুলো টাকা ওড়ানোর পরও খালিদ হোসেনের আক্ষেপ, তিনি নাকি এখনো অসুস্থ, কিন্তু খরচের চোটে থাইল্যান্ড যেতে পারছেন না।
অথচ প্রতি বছর দেশের লাখ লাখ সাধারণ মানুষ জমি-জমা বেচে, শেষ সম্বল বিক্রি করে চিকিৎসার জন্য ভারতে যান। ২০২৪ সালের আগের পরিসংখ্যান বলছে, বছরে ১৫ থেকে ১৭ লাখ বাংলাদেশি মেডিকেল ট্যুরিজমের নির্মম শিকার হয়ে দেশ ছাড়েন। এর বাইরে বিত্তবান ও সরকারি সুবিধাভোগীদের প্রথম পছন্দ থাইল্যান্ড আর সিঙ্গাপুর।
দেশের চিকিৎসা খাতের এই চরম ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে সাবেক এই ধর্ম উপদেষ্টা স্বভাবসুলভ কায়দায় দায় চাপান অতীতের সরকারগুলোর ওপর। দেশে কেন এত বছরেও একটি ভালো হাসপাতাল হলো না, কেন মাউন্ট এলিজাবেথের মতো সুযোগ-সুবিধা তৈরি করা গেল না—তা নিয়ে কুম্ভীরাশ্রু বিসর্জন করেন তিনি। ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা লুট আর পাচারের গল্প শুনিয়ে নিজের বিদেশ ভ্রমণকে ‘প্রমোদ ভ্রমণ নয়’ বলে সাফাই গান। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ক্যাবিনেটের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়েও তিনি কেন ক্যাবিনেট মিটিংয়ে এই নিয়ে জোরালো প্রশ্ন তোলেননি বা টেবিল চাপড়াননি? এর জবাবে তার তৈরি করা চেনা উত্তর প্রস্তুত ছিল—সব দোষ নাকি আমলাতান্ত্রিক জটিলতার। অর্থাৎ, ক্ষমতার চাবিকাঠি হাতে নিয়েও ব্যর্থতার দায় এড়ানোর এই চেনা কৌশল অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক।
আঠারো মাসের এই শাসনামলে বিদেশের চিকিৎসা বিলের ভাগ বসাতে ছাড়েননি কেউই। অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন, সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান—সবাই মেতেছিলেন রাষ্ট্রীয় টাকার এই শ্রাদ্ধে।
৭৯ লাখ টাকা গিলে দ্বিতীয় অবস্থানে সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন অন্তর্র্বর্তী সরকারের অর্থের চাবিকাঠি যার হাতে ছিল, সেই সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ আঠারো মাসে নিজের চিকিৎসার নামে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে সাবাড় করেছেন ৭৯ লাখ ৩৮ হাজার ২২৯ টাকা। ২০০৫ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব পালন করা এই ব্যক্তি নিজেকে অত্যন্ত সৎ দাবি করলেও দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর একবিন্দু ভরসা রাখতে পারেননি। তার দাবি, দেশের ডাক্তাররা নাকি তার রোগই ধরতে পারছিলেন না। ফলে মহা-উৎসবে তিন তিনবার সিঙ্গাপুরে উড়াল দেন তিনি।
লজ্জাজনক বিষয় হলো, এই উপদেষ্টাই দেশের মানুষের জন্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার যে বাজেট দিয়েছিলেন, সেখানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল ৪১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা—যা সামগ্রিক বাজেটের অতি সামান্য অংশ। নিজের বেলায় কোটি টাকা, আর আমজনতার স্বাস্থ্য বাজেটে এই চরম অবহেলা তাদের দ্বিমুখী নীতি ও চরম ভণ্ডামিকেই স্পষ্ট করে।
ব্যয়ের এই তালিকায় খালিদ ও সালেহউদ্দিনের পরেই আছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন, যিনি পকেটস্থ করেছেন ৮ লাখ ৭০ হাজার ৭৪৪ টাকা। দেশের সংস্কৃতি গড়ার কারিগর মোস্তফা সরয়ার ফারুকী নিজের চিকিৎসার পেছনে সরকারি তহবিল থেকে ওড়ালেন ৭ লাখ ১৫ হাজার 6৪৯ টাকা।
এ cordon ছাড়াও বিদ্যুৎ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান ৫ লাখ ৩৯ হাজার ৯৩৫ টাকা, ভূমি উপদেষ্টা হাসান আরিফ ২ লাখ ৬৭ হাজার ২১৬ টাকা, শিক্ষা উপদেষ্টা ড. এম আমিনুল ইসলাম ২ লাখ ৩৫ হাজার ৭২৯ টাকা এবং খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার ১ লাখ ৭০ হাজার ১৩৪ টাকা রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে পকেটে পুরেছেন।
বাকিদের খরচের বহরও কম নয়—পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ ৬৭ হাজার ৩৬৭ টাকা, শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ৩১ হাজার ০৫২ টাকা, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান ২১ হাজার ৮০০ টাকা এবং প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টা শেখ মইনউদ্দিন ৪ হাজার ১৬০ টাকা চিকিৎসা বিল বাবদ সরকারের কাছ থেকে তুলে নিয়েছেন।
অডিট ফাঁকি ও হরিলুটের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের এই চিকিৎসার দেখভাল করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। বিদেশ থেকে চিকিৎসার নামে ঘুরে এসে বিল জমা দিলেই তা সোজা চলে যায় উপদেষ্টাদের অ্যাকাউন্টে। দেশের ভেতরেও তারা সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত হাসপাতালে আলিশান চিকিৎসা পান, যেখানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অডিট বা নিরীক্ষা ফাঁকি দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে কেবল একটা কপি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠায়। মন্ত্রী বা উপদেষ্টাদের এই হরিলুটের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট বা কড়া নীতিমালা নেই। প্রতি অর্থবছরে একটা থোক বরাদ্দ থাকে, আর সেখান থেকেই প্রয়োজন অনুযায়ী এই কোটি কোটি টাকা বণ্টন করা হয়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই ঘটনাকে পুরোপুরি নিয়মবহির্ভূত এবং অনিয়ম হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন, এটি কোনো নিয়মিত মাসিক বা বার্ষিক ভাতা নয় যে ইচ্ছে করলেই পকেটে পোরা যাবে।
তিনি হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি কোনো ধরনের অসুস্থতার প্রমাণ বা সঠিক বিল-ভাউচার ছাড়া এই অর্থ ছাড় করা হয়ে থাকে, তবে যিনি নিয়েছেন এবং যারা এই অর্থ অনুমোদন ও ছাড়ের ফাইলে সই করেছেন—তারা প্রত্যেকেই চরম অপরাধ করেছেন। এর পেছনে কোনো গোপন আঁতাত ছিল কি না, তা খুঁজে বের করতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হওয়া এখন সময়ের দাবি। বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে সরকার যে স্বচ্ছতার বড় বড় বুলি আউড়েছিল, চিকিৎসা ব্যয়ের এই কোটি কোটি টাকার হরিলুটের পর তা এখন স্রেফ তামাশায় পরিণত হয়েছে।


