সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের কোম্পানিগুলোর পরিচালনা পর্ষদে আমলাদের প্রভাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। খাতসংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতা না থাকলেও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বর্তমান ও সাবেক আমলারা একাধিক কোম্পানির চেয়ারম্যান ও পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, জবাবদিহি ও করপোরেট ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে।
সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের অধীনে মোট ৩৭টি কোম্পানি রয়েছে। এসব কোম্পানির বোর্ড সদস্য ৩০৬ জন। এর মধ্যে চেয়ারম্যান ও পরিচালক পদে ১৬৭টি দায়িত্বেই আছেন বিভিন্ন পর্যায়ের আমলা। একই ব্যক্তি একাধিক কোম্পানির বোর্ডেও রয়েছেন।
একাধিক বোর্ডে একই কর্মকর্তা
নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সঙ্গে সরাসরি কাজের অভিজ্ঞতা না থাকলেও অনেক সচিব ও সিনিয়র কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ কোম্পানির চেয়ারম্যান বা পরিচালক হয়েছেন। কেউ কেউ নিজ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন, গ্যাস বিতরণ, তেল পরিশোধন কিংবা জ্বালানি বিপণন কোম্পানির বোর্ডেও যুক্ত রয়েছেন।
জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম একাধিক কোম্পানির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন। তিনি তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানির পাশাপাশি নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি, বাংলাদেশ চায়না পাওয়ার কোম্পানি এবং বাংলাদেশ চায়না রিনিউয়েবল এনার্জি কোম্পানির চেয়ারম্যান।
বিদ্যুৎ কোম্পানিতে প্রশাসন ক্যাডারের প্রভাব
বিদ্যুৎ বিভাগের ১৫টি কোম্পানিতে বোর্ড সদস্য রয়েছেন ১৩৬ জন। এর মধ্যে ৫৮ জনই প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণের মতো বিশেষায়িত খাতেও বিভিন্ন পর্যায়ের আমলাদের উপস্থিতি রয়েছে।
পাওয়ার গ্রিড, আশুগঞ্জ পাওয়ার, ডেসকো, ডিপিডিসি, নেসকো, কোল পাওয়ার, ওয়েস্ট জোনসহ প্রায় সব বড় কোম্পানির বোর্ডেই সচিব বা প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা রয়েছেন।
পেট্রোবাংলা ও বিপিসির বোর্ডেও একই চিত্র
পেট্রোবাংলার অধীন ১৪টি কোম্পানির ১০৮ বোর্ড সদস্যের মধ্যে ৭০ জনই আমলা। তিতাস, বাখরাবাদ, কর্ণফুলী, বাপেক্স, জিটিসিএল, জালালাবাদ ও সিলেট গ্যাস ফিল্ডের মতো প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের প্রভাব বেশি।
অন্যদিকে বিপিসির আট কোম্পানির ৬২ বোর্ড সদস্যের মধ্যে ৩৯ জন বর্তমান বা সাবেক আমলা। ইস্টার্ন রিফাইনারি, পদ্মা অয়েল, মেঘনা, যমুনা, এলপি গ্যাস ও স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিকের মতো কোম্পানিগুলোতেও একই ধারা দেখা যাচ্ছে।
বোর্ড মিটিংয়ে সম্মানি ও সুবিধা
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কোনো কোনো কোম্পানির বোর্ড মিটিংয়ে ৫০০ ডলার পর্যন্ত সম্মানি দেওয়া হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সম্মানি ৬ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকার মধ্যে। মাসে একাধিক বৈঠক হলে এই আয়ও বাড়ে।
এর বাইরে বোর্ড সদস্যরা বিদেশ সফর, গাড়ি সুবিধা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সুবিধাও পান। কোম্পানির কেনাকাটা, প্রকল্প অনুমোদন ও নীতিগত সিদ্ধান্তে বোর্ডের ভূমিকা থাকায় এসব পদকে প্রভাবশালী হিসেবেই দেখা হয়।
পেশাদারদের জায়গা কম
কোম্পানিগুলোর নিজস্ব কর্মকর্তাদের মধ্যে সাধারণত শুধু ব্যবস্থাপনা পরিচালক বোর্ডে থাকেন। প্রকৌশলী, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, আর্থিক ব্যবস্থাপক বা করপোরেট গভর্ন্যান্স বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ সীমিত। ফলে ব্যবসা পরিচালনায় মাঠের অভিজ্ঞতা থাকা কর্মকর্তারা অনেক সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাইরে থাকেন।
কোম্পানির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, আমলানির্ভর বোর্ড দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। অনেক প্রস্তাব পর্যালোচনার বদলে পরে উত্থাপনের পরামর্শ দেওয়া হয়। এতে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও দৈনন্দিন কার্যক্রমে বিলম্ব তৈরি হয়।
করপোরেট কাঠামোর দাবি
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত অত্যন্ত কারিগরি ও বিনিয়োগনির্ভর। এখানে পেশাদার বোর্ড, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, আর্থিক জ্ঞান এবং স্বাধীন পরিচালক থাকা জরুরি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, আমলাদের কাজ প্রশাসন চালানো, ব্যবসা পরিচালনা নয়। তাঁর মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি কোম্পানিগুলোর বোর্ড নতুন করে গঠন করে করপোরেট ধারায় পরিচালনা করা প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলোর বোর্ডে পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে বিনিয়োগ, সেবা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।


