বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে দেশের রফতানি আয়ে ২৫.৯১ শতাংশের এক বিশাল লাফ দেখা গেছে। তবে রফতানির এই বাহ্যিক উল্লম্ফন দেশের শিল্প খাতের ভেতরের প্রকৃত চিত্রকে আড়াল করতে পারছে না। খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের বড় একটি অংশ স্পষ্ট জানিয়েছেন, জুনের এই প্রবৃদ্ধি কোনো নতুন রফতানি আদেশের কারণে আসেনি; এটি মূলত ক্যালেন্ডারজনিত একটি সাময়িক প্রভাব। গত বছরের জুনে ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটির কারণে উৎপাদন কম হয়েছিল, যার বিপরীতে এবার জুনে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কার্যদিবস বেশি পাওয়ায় রফতানি বেশি দেখিয়েছে। মূলত পুরো অর্থবছর জুড়েই দেশের পণ্য রফতানি আগের চেয়ে প্রায় ১ শতাংশ এবং তৈরি পোশাক রফতানি ১.৬৪ শতাংশ কমেছে।
কাগজে-কলমে জুনের এই প্রবৃদ্ধি স্বস্তি দিলেও শিল্পাঞ্চলের বাস্তব চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গত দুই বছরে সারা দেশে পাঁচ শতাধিক শিল্পকারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে, যার ফলে শুধু তৈরি পোশাক খাতেই বেকার হয়েছেন প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক। বর্তমানে টিকে থাকা কারখানাগুলোর সিংহভাগই তাদের পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে না; গড়ে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ সক্ষমতা নিয়ে চলছে উৎপাদন।
এই নজিরবিহীন শিল্প সংকটের পেছনে মূল খলনায়ক হিসেবে কাজ করছে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট। গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলগুলোতে প্রয়োজনীয় চাপের মাত্র এক-পঞ্চমাংশ গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। লোডশেডিংয়ের কারণে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে জেনারেটরে ডিজেল পুড়িয়ে কারখানা চালু রাখতে হচ্ছে। এর ওপর শ্রমিকের মজুরি, সুতা ও ডাইং-কেমিক্যালের দাম ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়লেও আন্তর্জাতিক ক্রেতারা পণ্যের মূল্য বাড়াতে নারাজ। ফলে ক্রমাগত লোকসান গুণতে গিয়ে উদ্যোক্তারা চরম দেউলিয়া অবস্থার মুখে পড়েছেন।
ভবিষ্যতের রফতানি আদেশের সূচক ‘ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন’ (ইউডি)-এর চিত্রও বেশ নেতিবাচক। জুন মাসে নতুন অর্ডারের আর্থিক মূল্য আগের বছরের ২২৭ কোটি ডলার থেকে নেমে এসেছে ১৭৯ কোটি ডলারে। দেশের বৃহত্তম শিল্পাঞ্চল গাজীপুরেই গত এক সপ্তাহে লিথী গ্রুপ ও অ্যাপেক্স গ্রুপের একাধিক ইউনিটসহ ১৩টি বড় কারখানা বন্ধ হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ধাক্কা শুধু পোশাক খাতের নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য বড় বিপদ ডেকে আনবে। দীর্ঘমেয়াদি ধস ঠেকাতে এখন একক কোনো মাসের প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর না করে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, সহজ শর্তে ঋণ এবং কার্যকর পলিসি সহায়তার মাধ্যমে উৎপাদন ও বিনিয়োগ পরিস্থিতিকে দ্রুত শক্তিশালী করা জরুরি।


