জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মারাত্মক সমন্বয়হীনতা এবং সরাসরি ক্রয়নীতির (ডিপিএম) নামে অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের খেসারত দিচ্ছে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি। ভুঁইফোড় ও অনভিজ্ঞ বিদেশি কোম্পানির ওপর অযৌক্তিক নির্ভরতার কারণে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা নজিরবিহীন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট আরো ঘনীভূত হয়েছে। এর ওপর যুক্ত হয়েছে আকস্মিক বন্যায় নেপাল থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হওয়ার ধাক্কা, যা শিল্প উৎপাদনকে পুরোপুরি স্থবির করে দিয়েছে।
পেট্রোবাংলা ও মন্ত্রণালয়ের দুর্বল নজরদারির সুযোগে ডিপিএম পদ্ধতির আওতায় কার্গো আমদানির নামে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। অভিজ্ঞতাহীন ব্রিটিশ মালিকানাধীন ‘ব্ল্যাক কিউব’ নামক একটি নতুন কোম্পানি এবং নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত ‘জেন হু’ শিপিংয়ের মতো প্রতিষ্ঠানকে কার্গো সরবরাহের অনুমোদন দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তারা ব্যাংকিং গ্যারান্টি (এসবিএলসি) জমা দিতে এবং সময়মতো এলএনজি পাঠাতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে পেট্রোবাংলার পূর্বনির্ধারিত শিডিউল ভেঙে পড়ে এবং জরুরি ভিত্তিতে স্পট মার্কেট থেকে রেকর্ড সর্বোচ্চ দামে প্রতি ইউনিট প্রায় ২৪ ডলারে এলএনজি কিনতে বাধ্য হচ্ছে সরকার।
জ্বালানি খাতের এই দীর্ঘমেয়াদী সংকটের কারণে জাতীয় গ্রিডে ১১০ কোটি ঘনফুট সক্ষমতার বিপরীতে মাত্র ৭২ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে সারাদেশের শত শত শিল্পকারখানা স্বাভাবিক উৎপাদন চালাতে পারছে না। সরকারের উচ্চপর্যায়ের তাগিদ থাকা সত্ত্বেও মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরে থাকা একটি চক্রের কারণে খোলাবাজার থেকে সময়মতো সাশ্রয়ী মূল্যে এলএনজি কেনা সম্ভব হয়নি, যার মাশুল দিচ্ছে দেশের রপ্তানিমুখী খাতগুলো।
এদিকে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় নানা অজুহাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সারা দেশে দুই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি নেপালে আকস্মিক বন্যায় তাদের চিলিমে ও ত্রিশূল জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেখান থেকেও বিদ্যুৎ আমদানি আপাতত বন্ধ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আইপিপি বা বেসরকারি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালুর চেষ্টা করা হলেও, সরকারের কাছে তাদের জমা হওয়া প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার বকেয়া না মেটানোর কারণে তারা নতুন করে তেল আমদানির এলসি খুলতে পারছে না। সব মিলিয়ে অদক্ষ আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভরতার মাশুল হিসেবে দেশের শিল্প ও অর্থনীতি এখন খাদের কিনারে এসে ঠেকেছে।


