বিএনপি সরকার গঠন করার পর দেখতে দেখতে ছয় মাসের বেশি সময় পার হয়ে গেছে। তবে এই দীর্ঘ সময়ে বিশ্বের কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান বাংলাদেশ সফরে আসেননি। নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে গতি না থাকা এবং আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বের ঢাকা এড়িয়ে চলার এই বিষয়টিকে বড় ধরনের কূটনৈতিক স্থবিরতা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, ছয় মাসেও কোনো বিদেশি সরকারপ্রধানকে ঢাকায় আনতে না পারা বর্তমান সরকারের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও কূটনৈতিক দূরদর্শিতার ঘাটতিকেই স্পষ্ট করছে।
প্রথা অনুযায়ী, দেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম কয়েক মাসের মধ্যেই মিত্র দেশগুলোর শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের একাধিক সফর অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এটি শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়, বরং নতুন প্রশাসনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের গভীরতা প্রকাশ করে। কিন্তু গত ছয় মাসে ঢাকার কূটনৈতিক অঙ্গনে তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রপ্রধানের পদচারণ দেখা যায়নি।
কূটনৈতিক দূরত্ব ও প্রতিবেশী টানাপোড়েন
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া ও চীন সফর করলেও, পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে কার্যকর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশগুলোর শীর্ষ নেতাদের নীরবতা সরকারের পররাষ্ট্রনীতির দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে আসছে।
অন্যান্য দেশের পাশাপাশি প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বৈরী ভাবাপন্ন ও কৌশলগত টানাপোড়েন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যু এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি নিয়ে তৈরি হওয়া জটিলতায় নয়াদিল্লির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কে চরম স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিবেশীর সঙ্গে বিদ্যমান এই শীতল সম্পর্কের নেতিবাচক প্রভাব অন্য আন্তর্জাতিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হচ্ছে।
দিল্লি-ঢাকা দ্বিপক্ষীয় টানাপোড়েন
প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সরকারের নীতিগত ফারাক ও সুনির্দিষ্ট কিছু সংবেদনশীল ইস্যুতে স্পষ্ট সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারাকে এই কূটনৈতিক স্থবিরতার অন্যতম প্রধান কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রত্যর্পণ ইস্যুসহ আঞ্চলিক নানা ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে বর্তমানে দিল্লি ও ঢাকার সম্পর্কে একধরনের প্রচ্ছন্ন শীতলতা বিরাজ করছে। ভারতের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের কোনো বৈঠক বা সফর না হওয়া এবং সম্পর্কের জট না খোলায়, তার পরোক্ষ প্রভাব সার্বিক বৈশ্বিক সম্পর্কেও পড়ছে বলে অনেকের ধারণা।
বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও ভাবমূর্তির ঝুঁকি
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাস হলো আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজের শক্ত অবস্থান প্রতিষ্ঠা করার উপযুক্ত সময়। বিশ্বনেতাদের সফর না হওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বৈদেশিক বিনিয়োগ ও বহুজাতিক উন্নয়ন সহযোগিতার ওপর। শীর্ষ নেতাদের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি ছাড়া বিশ্বমানের মেগাপ্রকল্প বা বৈদেশিক বাণিজ্য চুক্তি এগিয়ে নেওয়া অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়ে।
এক অভিজ্ঞ সাবেক কূটনীতিক নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, “আন্তর্জাতিক রাজনীতির মূল নিয়াই হলো দৃশ্যমান এনগেজমেন্ট ও উচ্চপর্যায়ের সফর বিনিময়। ছয় মাসের মধ্যে কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের বাংলাদেশে না আসার অর্থ হলো আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ঢাকা এখন একধরনের বিচ্ছিন্নতা বা ধীরগতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এটি কাটিয়ে উঠতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদে বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ও বৈদেশিক সহায়তায় ধস নামতে পারে।”
অভ্যন্তরীণ নানা সংকট সামলানোর পাশাপাশি বিএনপি সরকার কীভাবে এই আন্তর্জাতিক স্থবিরতা ভাঙবে এবং আগামী দিনগুলোতে বিশ্বনেতাদের ঢাকায় এনে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করবে তা নিয়েই এখন দেশের কূটনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা চলছে।


