Homeঅপরাধ৩ দিনে ১,৮৫৬ অভিযোগ, ঘুষ চাওয়া হয়েছে ২৫ কোটি টাকা

৩ দিনে ১,৮৫৬ অভিযোগ, ঘুষ চাওয়া হয়েছে ২৫ কোটি টাকা

সরকারি সেবা নিতে গিয়ে কোন দপ্তরে কত টাকা ঘুষ চাওয়া হচ্ছে, সে তথ্য জানাতে তৈরি হয়েছে ‘ঘুষ ডট সাইট’ (ghush.site)। ভুক্তভোগীরা নাম-পরিচয় গোপন রেখে ঘুষ চাওয়ার অভিজ্ঞতা এ ওয়েবসাইটে জানাতে পারছেন। চালুর প্রথম তিন দিনে ১ হাজার ৮৫৬টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগ অনুযায়ী, ঘুষ হিসেবে চাওয়া হয়েছে ২৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।

ঘুষ ডট সাইট যাত্রা শুরু করেছে ২১ আগস্ট। এর দুই প্রতিষ্ঠাতা হলেন সাইফ কবির ও শাহেদ শরিফ। বিদেশের একটি ওয়েবসাইট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশে ওয়েবসাইটটি তৈরি করেন এ দুই বন্ধু। তাঁদের লক্ষ্য, বিচ্ছিন্নভাবে থাকা ঘুষের অভিজ্ঞতাগুলো এক জায়গায় এনে কোন সরকারি সেবা পেতে কোন দপ্তরে কত টাকা ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ রয়েছে, তার একটি চিত্র তৈরি করা। তবে ওয়েবসাইটে যুক্ত হওয়া তথ্যকে যাচাই করা অভিযোগ বা প্রমাণ হিসেবে দাবি করা হচ্ছে না।

ওয়েবসাইটে অভিযোগ জানাতে ব্যবহারকারীকে দপ্তরের নাম, সেবার ধরন, এলাকা, ঘুষ হিসেবে দাবি করা অর্থের পরিমাণ এবং শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল—এই পাঁচ ধরনের তথ্য দিতে হচ্ছে। সঙ্গে ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অভিযোগ জানাতে কোনো অ্যাকাউন্ট খোলার প্রয়োজন হয় না। পুরো প্রক্রিয়া দুই মিনিটের কম সময়ে শেষ করা যায়। তবে কোনো ব্যক্তির নাম, পদবি বা ফোন নম্বর উল্লেখ করা যায় না।

উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, এখানে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে চিহ্নিত করার চেয়ে কোন দপ্তর বা কোন ধরনের সরকারি সেবা ঘিরে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ বেশি আসছে, সেটি তুলে ধরাই মূল উদ্দেশ্য। তাঁরা বলছেন, অভিযোগ জমা দেওয়ার পর সেটি সরাসরি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয় না। প্রথমে মডারেশনের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য সরানো হয়। আক্রমণাত্মক, অস্পষ্ট বা নীতিমালা ভঙ্গ করে—এমন অভিযোগও বাদ দেওয়া হয়। এরপর অভিযোগ প্রকাশ করা হয়।

তিন দিনে ১৮৫৬ অভিযোগ

গতকাল সোমবার বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ১ হাজার ৮৫৬টি অভিযোগ জমা পড়েছে, যেখানে ঘুষ হিসেবে দাবি করা মোট অর্থের পরিমাণ ২৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।

বিভাগভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি ৮৬৯টি অভিযোগ এসেছে ঢাকা থেকে। এরপর চট্টগ্রামে ৪৩৮, রাজশাহীতে ১২২, খুলনায় ১১৫, রংপুরে ৯৮, সিলেটে ৭৯, ময়মনসিংহে ৭১ এবং বরিশালে ৬৪টি অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগকারীদের ১৮ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা ঘুষ দিতে অস্বীকার করেছেন।

তবে ওয়েবসাইটটির সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো, জমা পড়া প্রতিটি অভিযোগ আলাদাভাবে যাচাই করা হয় না। সাইটে প্রকাশিত প্রতিটি রিপোর্টের সঙ্গে ‘আনভেরিফায়েড’ শব্দটি উল্লেখ করা থাকে। উদ্যোক্তারা অবশ্য বলছেন, ঘুষ ডট সাইট কোনো অভিযোগকে সত্য ঘটনা বা কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করছে না। এটি কোনো তদন্ত সংস্থাও নয়, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বিকল্প হওয়ার দাবিও করছে না; বরং মানুষের অভিজ্ঞতাগুলো এক জায়গায় এনে একটি উন্মুক্ত রেকর্ড তৈরি করাই এর উদ্দেশ্য।

ভারতের সাইটটি বন্ধ

সাইফ কবির প্রথম আলোকে জানান, সম্প্রতি ভারতে জনপ্রিয় হয়েছিল ‘ব্রাইব ডট এফওয়াই আই’। ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর তথ্য বলছে, চলতি বছরের জুলাই মাসে ২০ বছর বয়সী একজন প্রকৌশল শিক্ষার্থী সাইটটি তৈরি করেন। দেড় মাসে সাইটটি দেশটিতে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়। তবে হঠাৎ চলতি মাসের ১৮ তারিখে সাইটটি বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দেয় এর উদ্যোক্তা।

ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভির ১৯ আগস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেষ ৪৮ ঘণ্টায় প্ল্যাটফর্মটিতে ৫০ লাখের বেশি অনুরোধ আসে এবং প্রায় দুই লাখ নতুন ব্যবহারকারী যুক্ত হন। এতে প্ল্যাটফর্মের সক্ষমতা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়। উদ্যোক্তারা জানান, এত বিপুলসংখ্যক মানুষের চাপ সামলানোর মতো অবকাঠামো তাঁরা তৈরি করেননি। একই সঙ্গে এত মানুষের সংবেদনশীল তথ্য নিরাপদে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার মতো সক্ষমতাও তাঁদের ছিল না। তাই নিজেদের সিদ্ধান্তেই প্ল্যাটফর্মটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এর আগেও ২০১০ সালে ভারতে একই ধরনের উদ্যোগ চালু হয়েছিল। এরপর আফ্রিকার কয়েকটি দেশে এ ধরনের ওয়েবসাইট চালু হওয়ার কথা জানা যায়।

ঘুষ ডট সাইট নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানতে চাইলে সাইফ কবির প্রথম আলোকে বলেন, এটি এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ তাঁদের অর্থায়নে চলছে। কেউ সাহায্য করতে চাইলে স্বেচ্ছা অনুদানের সুযোগও রাখা হয়েছে। তাঁদের প্রথম পরিকল্পনা হলো সাইটটি চালু রাখা। আর তথ্যের ভলিউম বাড়লেও মডারেশনের মান ধরে রাখা। এরপর ডেটার মান আরও উন্নত করা, যাতে দপ্তর ও সেবাভিত্তিক হিসাব বিশ্বাসযোগ্যভাবে মেলানো যায়; জেলা কাভারেজ বাড়ানো এবং তথ্য এমনভাবে উন্মুক্ত রাখা, যাতে সাংবাদিক ও গবেষকেরা নিজেরাই বিশ্লেষণ করতে পারেন।

তথ্য কাজে লাগানোর তাগিদ

২০১৭ সালে ইউরোপিয়ান ইকোনমিক রিভিউতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, শুধু বেনামে ঘুষের অভিজ্ঞতা জানানোর প্ল্যাটফর্ম থাকলেই ঘুষ কমবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। প্ল্যাটফর্মটি তুলনামূলক কার্যকর হয়, যখন সেখানে ঘুষের পরিমাণ ও স্থান সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকে এবং নাগরিকেরা সেই তথ্য ব্যবহার করে কম দুর্নীতিগ্রস্ত সেবা বা দপ্তর শনাক্ত করতে পারেন।

দেশের দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, পরিচয় গোপন রেখে ঘুষের অভিজ্ঞতা জানানোর সুযোগ তৈরি হওয়া ইতিবাচক উদ্যোগ। তিনি বলেন, নাগরিকেরা ঘুষের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা জানানোর সুযোগ পেয়েছেন—এটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই উদ্যোগের প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করবে সংগৃহীত তথ্য দিয়ে উদ্যোক্তারা কী করেন, তার ওপর।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নাগরিকদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সেগুলো বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানকে জানানো এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে। কারণ, মানুষ আশা নিয়ে এসব ঘটনা জানাচ্ছেন। তাঁদের দেওয়া তথ্য যদি কোনো কাজে না আসে, তাহলে একপর্যায়ে মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে।

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য