Homeঅর্থনীতি৭ মাসে জনশক্তি রপ্তানি কমেছে ৩২ শতাংশ, বাড়ছে ঝুকিপূর্ণ ইউরোপ যাত্রা

বৈদেশিক কর্মসংস্থানে ধস:
৭ মাসে জনশক্তি রপ্তানি কমেছে ৩২ শতাংশ, বাড়ছে ঝুকিপূর্ণ ইউরোপ যাত্রা

ভূ-রাজনৈতিক উত্তাপ ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতময় পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব এসে পড়েছে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে। ফলে চলতি বছরের শুরু থেকে আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত বিদেশে কর্মী গমনাগমনের সূচকে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবাসী আয় উপার্জনের অন্যতম এই খাতে কর্মসংস্থান কমেছে এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। তবে চিন্তার বিষয় হলো, বৈধ সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপ অভিমুখে অবৈধ বা অনিয়মিত যাত্রা বাড়ছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানসংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত ৪ লাখ ৮০ হাজার ১০৪ জন প্রবাসী কর্মী হিসেবে কাজের খোঁজে বিদেশে গেছেন। গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যাটি ছিল ৭ লাখ ৪ হাজার ৬০৩। হিসাব মতে, এক বছরের ব্যবধানে বিদেশে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমেছে ২ লাখ ২৪ হাজার ৪৯৯ জন, যা শতাংশের হিসাবে প্রায় ৩২ শতাংশ পতন।

প্রধান বাজার সৌদি আরবেই বড় ধাক্কা

বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মূল ভিত্তি সৌদি আরবের বাজারেই সবচেয়ে বড় পতন লক্ষ্য করা গেছে। চলতি বছরের ২২ আগস্ট পর্যন্ত দেশটিতে গেছেন ২ লাখ ৬৭ হাজার ১০৩ জন কর্মী। অথচ গত বছরের একই সময়ে সেখানে গিয়েছিলেন ৪ লাখ ৮২ হাজার ৯১৮ জন। অর্থাৎ এক বছরে কেবল সৌদি আরবেই বাংলাদেশি কর্মী যাওয়া কমেছে ২ লাখ ১৫ হাজার ৮১৫ জন, যা প্রায় ৪৫ শতাংশ কম।

একইভাবে কাতার ও কুয়েতের বাজারও মন্দার মুখোমুখি। চলতি বছর ২২ আগস্ট পর্যন্ত কাতারে গেছেন ৪২ হাজার ১০৫ জন, যা গত বছরের ৬৬ হাজার ৬৭৩ জনের তুলনায় প্রায় ৩৭ শতাংশ কম। কুয়েতে গেছেন ১৭ হাজার ২৫০ জন, যা গত বছরের ৩০ হাজার ৪২৯ জনের চেয়ে ৪৩ শতাংশ কম।

অবশ্য মধ্যপ্রাচ্যের অপর তিন দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান ও ইরাকে কর্মী যাওয়ার প্রবণতা কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী। চলতি বছর আমিরাতে ১৫ হাজার ৮০৩ জন (আগের বছরের চেয়ে ৮ হাজার ৬০১ জন বেশি), জর্ডানে ১১ হাজার ৪৬৩ জন (আগের চেয়ে ৪ হাজার ৪২০ জন বেশি) এবং ইরাকে ৪ হাজার ৮০৮ জন বাংলাদেশি কর্মী গেছেন।

সামগ্রিকভাবে সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, আমিরাত ও জর্ডান—এই পাঁচটি প্রধান বাজারে এবার মোট কর্মী গেছেন ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩২ জন। গত বছরের ৫ লাখ ৯৪ হাজার ২৬৫ জনের বিপরীতে যা প্রায় ৪১ শতাংশ কম।

ইউরোপ ও অন্যান্য শ্রমবাজারের হালচাল

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপের কয়েকটি দেশে নতুন কর্মী গমনের হার কিছুটা ইতিবাচক। সিঙ্গাপুরে ২২ আগস্ট পর্যন্ত গেছেন ৪৯ হাজার ৫৫৭ জন বাংলাদেশি, যা গত বছরের চেয়ে ৫ হাজার ২০৯ জন বেশি।

ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ইতালিতে চলতি বছর গেছেন ৬ হাজার ২৮৪ জন কর্মী, যা আগের বছরের চেয়ে ১ হাজার ২৪৬ জন বেশি। পর্তুগালে গিয়েছেন ৪ হাজার ৬৯৯ জন। তবে মালদ্বীপে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৩০৯ জনে।

দক্ষতা বনাম কর্মী পাঠানোর সংখ্যা

সংকটময় এই পরিস্থিতিতে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইউথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান মনে করেন, কেবল সংখ্যা দিয়ে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মূল্যায়ন সম্ভব নয়। তিনি জানান, গত পাঁচ বছরে সৌদি আরবে প্রায় ২৫ লাখ বাংলাদেশি গেলেও রেমিট্যান্স উল্টো কমেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে যেখানে সৌদি থেকে ৫.৭ বিলিয়ন ডলার এসেছিল, তা সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার কমে গেছে। তাই শুধু লোক না পাঠিয়ে দক্ষ কর্মী তৈরির দিকে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, মার্চে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর সাময়িকভাবে এই হার কমলেও সরকারের উচিত আগামী এক থেকে দুই বছরে অধিক দক্ষ কর্মী বিদেশে পাঠানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া।

অন্যদিকে অভিবাসন ও শরণার্থীবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, নতুন দেশে শ্রমবাজার উন্মুক্ত না করা এবং পুরোনো বাজারগুলো সম্প্রসারিত করতে না পারাই বাংলাদেশের মূল সমস্যা। প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা না বাড়ালে প্রবাসে যাওয়ার এই চাপ কমবে না।

ঝুঁকিপূর্ণ অবৈধ ইউরোপ যাত্রা ও প্রাণহানির পরিসংখ্যান

বৈধ উপায়ে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ায় বহু লোক বিপজ্জনক সমুদ্র ও স্থলপথ বেছে নিচ্ছেন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্যমতে, ২০২৫ সালে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে অনিয়মিতভাবে ইউরোপে যাওয়া অভিবাসীদের মধ্যে অর্ধেকেরই (৫০ শতাংশ) উৎস ছিল বাংলাদেশ।

আইওএমের ‘মিসিং মাইগ্র্যান্টস প্রজেক্ট’-এর পরিসংখ্যানে বলা হয়, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বের ৯টি ঝুঁকিপূর্ণ পথে ৮৪টি দুর্ঘটনায় অন্তত ১ হাজার ৩২৯ জন বাংলাদেশি মারা গেছেন এবং ৮৫৯ জন নিখোঁজ রয়েছেন। বিশেষ করে তিউনিসিয়া বা লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার ভয়ংকর পথে ১ হাজার ১৭১ বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৭৭৩ জন নিখোঁজ হয়েছেন।

শরিফুল ইসলাম হাসান সতর্ক করে বলেন, ভিজিট বা ট্যুরিস্ট ভিসায় বিদেশে গিয়ে অবৈধভাবে কাজ খুঁজতে গিয়ে অনেকে মানবপাচারকারীদের শিকার হচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর জানান, যাদের ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা খরচের ক্ষমতা আছে, তারা অনেকেই মধ্যপ্রাচ্যে না গিয়ে স্থায়ী হওয়ার আশায় অবৈধ উপায়ে ইউরোপের পথ ধরছেন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আশ্রয়ের আবেদনের যে ধারা শুরু হয়েছিল, তার প্রভাব এখনও রয়ে গেছে।

পুরো খাতকে সংকটমুক্ত করতে বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম সরকার ও সব অংশীজনকে নিয়ে একটি বিশেষ ‘কোর কমিটি’ গঠনের পরামর্শ দেন এবং বিদেশে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া পুরোপুরি সিন্ডিকেটমুক্ত রাখার দাবি জানান।

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য