শজুড়ে নানামুখী অপরাধকে কেন্দ্র করে হামলা, সশস্ত্র চাঁদাবাজি ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে। পুলিশি তদন্তে অধিকাংশ নৃশংস ঘটনার নেপথ্যে উঠে আসছে মাদকের প্রভাব ও অবাধ অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার। দিনদুপুরে প্রকাশ্যে গুলি এবং নেশার টাকার জন্য আপন জন্মদাতা মা-বাবাকে কুপিয়ে হত্যার মতো ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি করেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মাদক কারবারি, অবৈধ অস্ত্রধারী ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন।
নির্দয় নৃশংসতা ও দিনে ১০ খুন
সম্প্রতি রংপুরের জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী এবং তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিজ বাড়িতে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় দুই তরুণ এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড ঘটায় বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ।
গত বুধবার রাজধানীতে এক চিকিৎসককে চলন্ত মাইক্রোবাসে তুলে হাত-পা ও চোখ বেঁধে নির্যাতন চালিয়ে মুক্তিপণ আদায় করে এক দল সন্ত্রাসী, যারা মাদক কারবার ও অস্ত্র বাণিজ্যে জড়িত। এর আগে গত ১৭ আগস্ট ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ইএনটি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আসাদুর রহমানের ওপর হামলা চালায় অবৈধ অস্ত্রধারী চাঁদাবাজ চক্র।
পুলিশ সদর দপ্তরের গত সাত মাসের মামলার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ২ হাজার ৭৩টি হত্যা মামলা হয়েছে। গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৩০০ জন এবং দিনে অন্তত ১০ জন মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। এর মধ্যে মে মাসে ৩১০, জুনে ৩২৩ এবং জুলাইয়ে ২৯৮ জন হত্যার শিকার হয়েছেন। একই সময়ে জুলাই মাসে ১১৩টি ডাকাতি-ছিনতাই, ৭২টি অপহরণ, ২৩৩৬টি নারী-শিশু নির্যাতন এবং ২৮৭টি চুরির মামলা রেকর্ড করা হয়েছে।
মাদকের বিষাক্ত ছোবলে ভাঙছে পরিবার
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার ৪.৮৮ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৮২ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত, যাদের বড় অংশই তরুণ। মাদকের টাকার জোগাড় করতেই তরুণেরা ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও খুনাখুনির পথ বেছে নিচ্ছে।
জুলাই মাসেই কেবল মাদকের জেরে ৩০ জন খুন হয়েছেন। এর মধ্যে নেশার টাকা না পেয়ে ছেলের হাতে খুন হতে হয়েছে তিন বাবা ও দুই মাকে। গত ৩০ জুলাই ফরিদপুরে টাকা না পেয়ে মা সাহেলা বেগমকে হত্যা করে ছেলে আব্দুর রহিম শেখ। ২৫ জুলাই চট্টগ্রামের আনোয়ারায় মাদকাসক্ত ছেলের ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারান মা-বাবা উভয়েই। ৩ জুলাই পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে তাপস দেবনাথ নামের এক তরুণ শিল-নোড়া দিয়ে ঘুমন্ত বাবা উত্তম দেবনাথকে হত্যা করে। ভৌগোলিক হিসেবে ঢাকা ও চট্টগ্রাম রেঞ্জে হত্যাকাণ্ডের হার সবচেয়ে বেশি।
অস্ত্রের মহড়া ও দূতাবাসের ই-মেইল আতঙ্ক
গত সাত মাসে দেশে অন্তত ১১০টি গুলির ঘটনা ঘটেছে। সবচেয়ে বেশি ৩৭টি গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে খুলনায়, যেখানে গত বুধবার লবণচরায় প্রকাশ্যে দুজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। চট্টগ্রাম ও রাজধানীতেও একাধিক প্রকাশ্যে গুলির ঘটনা ঘটেছে।
এদিকে, ঢাকার চীন, রাশিয়া, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান দূতাবাসে অর্থ দাবি করে লাটভিয়া থেকে রহস্যময় ই-মেইল পাঠানো হয়েছে। কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) জানায়, বিকাশ ও ক্রিপ্টোকারেন্সিতে টাকা না দিলে বিস্ফোরণের হুমকি দেওয়া ই-মেইলটির উৎস অনুসন্ধানে কাজ করছে পুলিশ।
মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএসএসএফের প্রতিবেদনে জানা যায়, সাত মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৬২ জন নিহত ও ৫ হাজার ২৪৬ জন আহত হয়েছেন। মব ভায়োলেন্সে প্রাণ গেছে ১৩৩ জনের।
সার্বিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, “অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কোনো দলীয় প্রভাব বরদাশত করা হবে না। পেশাদারির সঙ্গে আইন ও জনগণের সুরক্ষায় কাজ করছে পুলিশ।”


