Homeঅপরাধবিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখিয়ে প্রতারণা: চক্রের জালে নিঃস্ব পরিবার

জিম্মি শত শত শিক্ষার্থী
বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখিয়ে প্রতারণা: চক্রের জালে নিঃস্ব পরিবার

উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে ২০২০ সালে দেশ ছেড়েছিলেন এক তরুণ। লক্ষ্য ছিল ভারতের একটি নামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়া। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। চার বছরের পড়াশোনা শেষ করেও হাতে মেলেনি সনদ; আটকে আছে ফলাফল। যে প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে ভারতে গিয়েছিলেন, সেই ‘ফেইথ ওভারসিজ’ এখন সনদ পাইয়ে দেওয়ার কথা দাবি করছে অতিরিক্ত অর্থ।

ওই তরুণের মতো ১২৫ জন শিক্ষার্থীকে এভাবে জিম্মি করে রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। তাঁদের অভিযোগ, শতভাগ স্কলারশিপ ও বিনা খরচে আবাসনসহ নানা সুযোগ-সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রথমে নেওয়া হয়েছে মোটা অঙ্কের টাকা। বিদেশে যাওয়ার পর জানা গেছে প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। পড়াশোনার শেষ পর্যায়ে এসে কারো ফল আটকে গেছে, আবার কারো সনদ। এরপর সেই সনদ বা ফলাফল পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে আবারও অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হচ্ছে।

কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, উচ্চশিক্ষার স্বপ্নে বিভোর শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে দেশজুড়ে বিস্তৃত হচ্ছে প্রতারণার জাল। কনসালটেন্সি ফার্মগুলোর চটকদার বিজ্ঞাপন ও ভুয়া প্রতিশ্রুতির আড়ালে গত দুই দশকে প্রতারিত হয়েছেন হাজার হাজার শিক্ষার্থী। বর্তমানে রাজধানীর ফার্মগেট, মতিঝিল, উত্তরা ও গুলশানের মতো এলাকায় ৩ শতাধিক প্রতিষ্ঠান সক্রিয় রয়েছে, আর সারা দেশে যার সংখ্যা দুই সহগ্রাধিক।

ভিসা গাইড ও বিএসবি কেলেঙ্কারি

সম্প্রতি ‘ভিসা গাইড’ নামের একটি কথিত এজেন্সির ভয়ংকর জালিয়াতি সামনে এসেছে। বিভিন্ন সময় তারা ‘জাস্ট থট এডুকেশন কনসালট্যান্ট’, ‘গ্লোবাল ভিসা স্টেশন’, ‘গ্লোবাল ইমিগ্রেশন এক্সপার্ট’ ও ‘গো ভিসা’ নামে চটকদার বিজ্ঞাপন দিত। একপর্যায়ে প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে অন্তত ৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে অফিস বন্ধ করে পালিয়ে যায় তারা। এ ধরনের প্রতারণার অভিযোগে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বিএসবি গ্লোবাল নেটওয়ার্কের চেয়ারম্যানকে গ্রেপ্তার করেছিল, যার বিরুদ্ধে ১৪১ জন শিক্ষার্থীর ১৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ রয়েছে।

চক্রগুলো সাধারণত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘আইইএলটিএস ছাড়া ভর্তি’, ‘শতভাগ ভিসা গ্যারান্টি’ কিংবা ‘এক সপ্তাহে ভিসা’র মতো আকর্ষণীয় প্রলোভন দেখিয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বীকৃত পার্টনার না হয়েও মিথ্যা তথ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করে টিউশন ফির নামে মোটা অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করা হয়।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন

এই জালিয়াতির কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পোর্টল্যান্ড স্টেট ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ ও ভারত থেকে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠানো প্রায় ৬৫ শতাংশ আবেদনই জালিয়াতিপূর্ণ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই ব্যাপক অনিয়মের কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো ভিসা ফি বাড়ানোর পাশাপাশি কড়াকড়িও জোরদার করেছে।

ফেইথ ওভারসিজের প্রতারণার ফাঁদ

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২০ সালে ১২৫ জন শিক্ষার্থীকে ভারতে পাঠিয়ে জনপ্রতি এক লাখ ৭০ হাজার থেকে আট লাখ ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেয় ফেইথ ওভারসিজ। ভুক্তভোগী এক শিক্ষার্থী উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভারতের বেঙ্গালুরুতে অবস্থিত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তাঁকে জানানো হয়েছিল, ‘স্টাডি ইন ইন্ডিয়া’ স্কলারশিপের আওতায় যাবতীয় খরচ বিশ্ববিদ্যালয় বহন করবে। এর বিপরীতে তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে এক লাখ ৮০ হাজার টাকা প্রদান করেন।

কিন্তু ভারতে পৌঁছানোর পর তিনি দেখতে পান স্কলারশিপের কোনো অস্তিত্ব নেই। শিক্ষাজীবনের শেষ পর্যায়ে ফাইনাল পরীক্ষার আগে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তিন লাখ ভারতীয় রুপি দাবি করে। ফেইথ ওভারসিজকে জানালে তারা সহযোগিতার পরিবর্তে সাফ জানিয়ে দেয় এই টাকা না দিলে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া যাবে না। অনেক অনুনয়-বিনয় করে পরীক্ষায় বসলেও ফলাফল আটকে দেওয়া হয়। পরে ডিগ্রি ও সনদ সংগ্রহ করতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটি আরও দেড় লাখ টাকা দাবি করে এবং স্বাস্থ্য বীমার নামেও অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেয়। প্রতিকার চেয়ে উত্তরা পূর্ব থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

শহরজুড়ে গড়ে উঠেছে প্রতারকচক্র

রাজধানীর মহাখালী, বনানী, গুলশান, গ্রিন রোড ও পল্টনসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে এমন অসংখ্য কনসালটেন্সি ফার্ম। গ্রিন রোডের একটি ভবনেই রয়েছে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান, যার অনেকগুলোই তালাবদ্ধ। ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীরা এসে প্রায়ই খোঁজ নিয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কনসালটেন্সি ফার্মের মালিক জানান, চটকদার বিজ্ঞাপন দেওয়া এসব প্রতিষ্ঠানের মূল কাজই হলো কম জ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে প্রতারণা করা এবং অনেক ক্ষেত্রে মানবপাচারের সঙ্গেও তারা জড়িত।

নীতিমালার ঘাটতি ও সুনির্দিষ্ট দাবি

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ ধরনের কনসালটেন্সি ফার্ম নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা বা অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেই। সিটি করপোরেশন থেকে একটি ট্রেড লাইসেন্স নিয়েই প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কনসালটেন্সি ফার্মগুলো মূলত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়।

এদিকে নামসর্বস্ব ও অনুমোদনহীন এডুকেশন কনসালটেন্সি ফার্মগুলোর অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লাগাম টানতে সরকারের কাছে কঠোর রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক বা নীতিমালা তৈরির জোরালো দাবি জানিয়েছেন উচ্চশিক্ষা খাত সংশ্লিষ্ট সংগঠনের নেতারা।

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য