Homeঅর্থনীতিদেশের বেশিরভাগ সম্পদ ১০ শতাংশের হাতে

চরম আয়বৈষম্যের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ
দেশের বেশিরভাগ সম্পদ ১০ শতাংশের হাতে

দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ঝুলিতে প্রাপ্তি ও সাফল্য বহুলাংশে দৃশ্যমান হলেও এর পেছনের চাদরে ধীরে ধীরে দানা বাঁধছে এক গভীর ক্ষত। কোটি মানুষের শ্রমে-ঘামে অর্থনীতির চাকা সচল থাকলেও সেই অর্জনের সিংহভাগ জমা হচ্ছে গুটিকয়েক মানুষের হাতে। যার ফলে চরম আয়বৈষম্যের ঝুঁকিতে পড়েছে বাংলাদেশ। বর্তমানে দেশের শীর্ষ ১০ শতাংশ ধনীর হাতেই রয়েছে সিংহভাগ সম্পদ।

খোদ সরকারি হিসাব অনুযায়ী, শীর্ষ ১০ শতাংশের আয় সর্বনিম্ন ৪০ শতাংশ মানুষের সামষ্টিক আয়ের ৩ দশমিক ১৮ গুণ বেশি। গত চার দশকে দেশে আয়বৈষম্যের চিত্র ক্রমাগত খারাপ হয়েছে। ওপরে থাকা মানুষের আয় যে হারে লাফিয়ে বেড়েছে, এর বিপরীতে নিচের দিকে থাকা মানুষগুলোর আয় কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দারিদ্র্যের হার, যা একসময়ের সাফল্যের গল্পকে মলিন করে দিচ্ছে এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে ঠেলে দিচ্ছে চরম দারিদ্র্যঝুঁকিতে।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রণীত পঞ্চবার্ষিক স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্কে এসব তথ্য উঠে এসেছে। চলতি অর্থবছর থেকে ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এই রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে।

জিইডির সদস্য (সচিব) ড. মঞ্জুর হোসেন জানান, বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় বৈষম্য একটি প্রধান উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখা দিয়েছে। ২০২২ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী, জাতীয় গিনি সহগ হলো শূন্য দশমিক ৪৯৯, যা উচ্চবৈষম্যের নির্দেশ করে। এর মধ্যে গ্রামাঞ্চলের গিনি সহগ শূন্য দশমিক ৪৪৬ হলেও শহরাঞ্চলে তা শূন্য দশমিক ৫৩৯, যা শহরভিত্তিক আয়বৈষম্যের প্রকট রূপ ফুটিয়ে তোলে। এছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অর্থায়ন ও প্রযুক্তিতে অসম প্রবেশাধিকার কাঠামোগত বৈষম্যকে আরও শক্তিশালী করছে।

ফ্রেমওয়ার্কে বলা হয়েছে, দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে জনসংখ্যার একটি বড় অংশ জনাকীর্ণ বসতি, অপর্যাপ্ত আবাসন এবং অপ্রতুল সরকারি সেবার মুখে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে। অনানুষ্ঠানিক ও স্বল্প বেতনের পেশায় নিযুক্ত থাকা এই কর্মীরা সামাজিক সুরক্ষা ছাড়াই মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক মন্দার শিকার হচ্ছেন।

ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৮৩-৮৪ সালে সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের আয় ছিল সবচেয়ে দরিদ্র ৪০ শতাংশের সম্মিলিত আয়ের প্রায় দেড় গুণ। ২০২২ সাল নাগাদ এই অনুপাত দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ৩ দশমিক ১৮-এ পৌঁছায়। রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধি এবং তৈরি পোশাক খাত কর্মসংস্থান বাড়ালেও তার সুফল মূলত উচ্চ আয়ের গোষ্ঠীই ভোগ করেছে।

অর্থনৈতিক অগ্রগতি সত্ত্বেও দারিদ্র্যের প্রকৃতি বহুমাত্রিক রূপ ধারণ করেছে। সাম্প্রতিক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, মাঝারি দারিদ্র্য ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে এবং চরম দারিদ্র্য ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। নামমাত্র দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করা পরিবারগুলোও দুর্যোগ বা অসুস্থতার কারণে সহজে ঝুঁকিতে পড়ছে।

এই পরিস্থিতি উত্তরণে আগামী পাঁচ বছরে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও প্রকৃত আয় বৃদ্ধির সংযোগ স্থাপন, শ্রমবাজার সংস্কার, খাতভিত্তিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা। পাশাপাশি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ উন্নয়ন, শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো, লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং বাজেট বরাদ্দে অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য