দেশের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের মানবিকতা ও নৈতিকতার শিক্ষা দেওয়ার কথা থাকলেও কিছু শিক্ষকের হিংস্র ও অনৈতিক আচরণে কলঙ্কিত হচ্ছে শিক্ষা পরিবেশ। চলতি ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত মাত্র তিন মাসে দেশের এক-চতুর্থাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই যৌন হয়রানির ৭১টি অভিযোগ উঠে এসেছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেমের (ডিএমএস) মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
মাউশির মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন উইংয়ের এই প্রতিবেদনে ঘটনাগুলোকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর হিসেবে চিহ্নিত করে দ্রুত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নজরদারি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানদের কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ এবং প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
৯২৬ অভিযোগের বিপরীতে তদারকিতে ঘাটতি
ডিএমএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিন মাসে ৫ হাজার ৪৩১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের পর যৌন হয়রানিসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও অভিযোগ জমা পড়ে মোট ৯২৬টি। এর মধ্যে ৮৪৫টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়েছে, যার নিষ্পত্তির হার ৯১.২ শতাংশ। পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২ হাজার ৩০৫টি প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো অভিযোগ আসেনি। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিযোগ না আসা মানেই যৌন হয়রানি না থাকা বোঝায় না; বরং সচেতনতার অভাব ও গোপনীয়তা রক্ষার পরিবেশ না থাকার ওপরও এটি নির্ভর করে।
অন্যদিকে, এই স্পর্শকাতর বিষয়টি মনিটরিং বা তদারকির ক্ষেত্রে মাউশির মাঠপর্যায়ে বড় ধরনের ঘাটতি সামনে এসেছে। এপ্রিল-জুন মেয়াদে ২০ হাজার ১৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের পরিকল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সম্পন্ন হয়েছে মাত্র ৫ হাজার ৪৪৭টি, যা লক্ষ্যের মাত্র ২৭.২১ শতাংশ। আবার এই সম্পাদিত পরিদর্শনের ৭০.৪ শতাংশই হয়েছে নির্ধারিত সময়ের পর বিলম্বিতভাবে।
হাইকোর্টের নির্দেশনা ও প্রতিরোধ সেলের অনুপস্থিতি
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ২০০৯ সালে হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশনায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে একটি করে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ সেল ও তদন্ত কমিটি গঠনের আদেশ থাকলেও দেশের সিংহভাগ স্কুলে এখনো তা কার্যকর হয়নি। ফলে শিক্ষার্থীরা তাদের অভিযোগ জানানোর মতো নিরাপদ পরিবেশ ও নিরপেক্ষ তদন্ত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
| পরিদর্শনের সূচক (এপ্রিল-জুন ২০২৬) | পরিসংখ্যান |
| পরিকল্পিত মোট পরিদর্শন | ২০,০১৮টি |
| সম্পাদিত মোট পরিদর্শন | ৫,৪৪৭টি (২৭.২১%) |
| সময়মতো সম্পন্ন পরিদর্শন | ২৯.৬% |
| বিলম্বিত পরিদর্শন | ৭০.৪% |
| মোট জমা পড়া অভিযোগ | ৯২৬টি |
| যৌন হয়রানি সংক্রান্ত অভিযোগ | ৭১টি |
মাউশি মহাপরিচালকের বক্তব্য
প্রতিবেদনের তথ্যকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল জানান, “যৌন হয়রানির এই তথ্য নিঃসন্দেহে ভাবনার বিষয়। এখনো অধিকাংশ বিদ্যালয়ে প্রতিরোধ কমিটি করা সম্ভব হয়নি। তবে সারা দেশে এমন ঘটনার চিত্র পেতে মাউশির ডিএমএস অ্যাপে নতুন একটি সূচক যুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে যৌন হয়রানি প্রতিরোধসংক্রান্ত নির্দেশিকা অনুমোদন ও নিয়মিত তদারকির বিষয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।”


