গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে সর্বনাশের ঘণ্টা বাজতে শুরু করেছে। প্রয়োজনীয় চাপের গ্যাস না পেয়ে শিল্পকারখানাগুলোতে উৎপাদন অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে এবং চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, হবিগঞ্জ ও নরসিংদীর বহু ভারী শিল্পকারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে সময়মতো রপ্তানি পণ্য জাহাজীকরণ অসম্ভব হয়ে পড়বে, অনেক প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়ে দেউলিয়া হবে এবং ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে বলে চরম আশঙ্কা প্রকাশ করছেন শিল্পোদ্যোক্তারা।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদকে সম্প্রতি চিঠি দিয়ে জুলাই ও আগস্ট মাসের গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল আগামী ১২ মাসে কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ চেয়েছে নিট পোশাক শিল্পমালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ । গ্যাস সংকটের কারণে জেনারেটরে বিকল্প ডিজেল ব্যবহার করতে গিয়ে উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাায় এ আবেদন জানানো হয়।
রপ্তানি সরবরাহ শৃঙ্খলে ধস
বাংলাদেশের মূল রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প কেবল সেলাইয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়। সুতা, ডাইং, ওয়াশিং, ফিনিশিং ও প্যাকেজিং—সবকটি ধাপই নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। গ্যাসের অভাবে এই চেইনের একটি ধাপ আটকে গেলেই পুরো রপ্তানি বন্ধ হয়ে পড়ার উপক্রম হয়।
বিজিএমইএর (BGMEA) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান (বাবু) এ নিয়ে তীব্র শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “উৎপাদন ব্যাহত হলে সময়মতো শিপমেন্ট সম্ভব হবে না। এতে অনেক প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়ে দেউলিয়া হতে পারে এবং ব্যাংকের দায় বাড়বে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় অন্তত তিন-চারটি এফএসআরইউ (FSRU) সার্বক্ষণিক সচল রাখতে হবে এবং দ্রুত অনশোর এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের দিকে যেতে হবে।”
নিত্যপণ্য উৎপাদন অচল, বাজারে অস্থিতিশীলতার ভয়
জ্বালানি সংকটের থাবা পড়েছে ভোজ্যতেল, আটা, ময়দা, চিনি ও লবণের মতো নিত্যপণ্য উৎপাদনকারী কারখানাগুলোতেও: মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ : তাদের ৬০-৭০টি কারখানার মধ্যে ভোগ্যপণ্য খাতের ১৫টি কারখানার বেশিরভাগই বন্ধ। বাকিগুলোতে দিনে মাত্র ৬-৭ ঘণ্টা কাজ হওয়ায় উৎপাদন অর্ধেকের নিচে নেমেছে। টি কে গ্রুপ: ২৯টি কারখানার মধ্যে ২৫টিরও বেশি কারখানা গত বুধবার থেকে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ভোজ্যতেলসহ স্টিল, পার্টিক্যাল বোর্ড ও কেমিক্যাল কারখানার চাকাও থমকে গেছে।
বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা ও ব্যাংকিং খাতে ধাক্কা
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ২৫টি কোম্পানির প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফরে প্রধানমন্ত্রী ও নীতি নির্ধারকদের কাছে প্রথম ও প্রধান শর্তই ছিল নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানির নিশ্চয়তা। চলতি সপ্তাহে ভারতের একটি উচ্চপর্যায়ের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের সফরে আসার কথা থাকলেও সরকারের নতুন গ্যাস সংযোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্তে বিনিয়োগ খরা কাটার সম্ভাবনা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে কারখানাগুলোর আয় কমে গেলে ব্যাংকের ঋণের কিস্তি খেলাপি হওয়ার নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, “তাৎক্ষণিক সংকট সামাল দিতে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে জোর না দিলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে।”


