চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যকার বিশাল ব্যবধানের কারণে সারাদেশে তীব্র হয়ে উঠেছে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট। বর্তমানে দেশে দৈনিক ৩৮০ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে গ্যাস সরবরাহ নেমেছে ২৪৩ কোটি ঘনফুটে। অন্যদিকে, প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি ও আর্থিক সংকটের কারণে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১৪-১৫ হাজার মেগাওয়াট। ফলে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস বসে থাকলেও ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা টানতে হচ্ছে সরকারকে।
জ্বালানির এই তীব্র সংকটে কারখানাগুলোর চাকা থমকে যাওয়ায় মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছেন দেশের শিল্পোদ্যোক্তারা।
রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধির পরও মেলেনি নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ
শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০২৩ সালের শুরুতে আওয়ামী লীগ সরকার গ্যাসের দাম ১৭৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ায়। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নতুন সংযোগে দাম আরও ৩৩ শতাংশ বাড়ানো হয়। রেকর্ড দাম বাড়ানোর পরও সংকট দূর হয়নি, উল্টো পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
সম্প্রতি টার্মিনাল বিকল হয়ে এলএনজি সরবরাহ ১৯৩ কোটি ঘনফুটে নেমে এলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দৈনিক প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুটে নামানো হয়। এতে দেশের সিংহভাগ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ বা ব্যাহত হয়ে পড়ে। বর্তমানে টার্মিনাল সচল হওয়ায় সরবরাহ কিছুটা বেড়ে সরবরাহ ২৪৩ কোটি ঘনফুটে উন্নীত হলেও শিল্প খাতের স্বস্তি ফেরেনি।
নিট পোশাক শিল্পমালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “নিরবচ্ছিন্ন গ্যাসের আশায় ১২ টাকার গ্যাস ৩০ টাকায় মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু উল্টো উৎপাদন বন্ধ হয়ে ব্যয় বেড়ে গেছে এবং ব্যাংক ঋণ পরিশোধের জটিলতা তৈরি হয়েছে।”
আটকে আছে ৫৫০ কারখানার ডিম্যান্ড নোটের টাকা
রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছে বর্তমানে শিল্প সংযোগের প্রায় ১,৮০০টি আবেদন জমা পড়ে আছে। এর মধ্যে প্রায় ৫৫০টি প্রতিষ্ঠান ডিম্যান্ড নোটের টাকা জমা দিয়ে সকল প্রক্রিয়া শেষ করলেও বছরের পর বছর গ্যাস পাচ্ছে না। ফলে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের পর কারখানা চালু করতে না পেরে উদ্যোক্তাদের প্রতি মাসে বিপুল অংকের ঋণের সুদ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় মেটাতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এ প্রসঙ্গে জানান, বিগত সরকারের আমলে কোনো নিয়ম-নীতি মানা হয়নি। জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে কাজ চলছে এবং সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে ডিম্যান্ড নোটের টাকা জমা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
চাহিদা ও সরবরাহের চিত্র
পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, সরবরাহের ক্ষেত্রে গড়ে ৪১ শতাংশ বিদ্যুৎ খাতে, ৩৬ শতাংশ শিল্পে (ক্যাপটিভসহ), ১১ শতাংশ বাসাবাড়িতে, ৬ শতাংশ সারে এবং বাকি অংশ সিএনজি ও চা বাগান খাতে দেওয়া হয়।
- মোট গ্যাস চাহিদা: ৩৮০ কোটি ঘনফুট (বাস্তবে ৫০০ কোটি ঘনফুটের বেশি)।
- বর্তমান সরবরাহ: ২৪৩ কোটি ঘনফুট (দেশীয় কূপ থেকে ১৬২ কোটি ও এলএনজি থেকে ৮১ কোটি)।
- বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা: ২৯,০০০ মেগাওয়াট।
- বর্তমান চাহিদা ও উৎপাদন: চাহিদা ১৬-১৭ হাজার মেগাওয়াটের বিপরীতে উৎপাদন ১৪-১৫ হাজার মেগাওয়াট।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে নজর না দিয়ে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানিতে বেশি জোর দেওয়ার ফলেই এই সংকট তৈরি হয়েছে।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম জ্বালানি খাতের অসংগত ও লুণ্ঠনমূলক ব্যয় ছেঁটে ফেলার তাগিদ দেন। তিনি এলএনজি আমদানি ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে সীমিত রেখে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক ব্যয়বহুল কেন্দ্র বাতিল এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের পরামর্শ দেন।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক সদস্য মকবুল-ই-ইলাহী চৌধুরী দ্রুত সংকট নিরসনে স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।


