ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পোশাকের বাজারে বড় ধরনের ধস নেমেছে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে জোটটির মোট পোশাক আমদানি মূল্য কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ। তবে বিশ্বজুড়ে ক্রেতাদের কেনাকাটার যে মন্দা ও সংকুচিত বাজার তৈরি হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির পতন ঘটেছে সামগ্রিক মন্দার প্রায় দ্বিগুণ হারে। জানুয়ারি-জুন সময়ে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ১৬.৪৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৮.৬৪ বিলিয়ন ইউরোতে।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্যে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ইইউ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মোট ৪১.১০ বিলিয়ন ইউরোর পোশাক আমদানি করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ আমদানি কমেছে ৯.৭০ শতাংশ। সামগ্রিক বাজার যেখানে সংকুচিত হয়েছে, সেখানে একই সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানি কমার এই বিশাল ব্যবধানই তৈরি পোশাক খাতের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
শুধু চাহিদা কমা নয়, বাংলাদেশের আলাদা চাপ
ইইউর বাজারে পোশাক আমদানি কমার কারণে চীন, তুরস্ক, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও কম্বোডিয়ার মতো প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর রপ্তানিও কমেছে। তবে বাংলাদেশের সমস্যা হলো—বাজার ছোট হওয়ার পাশাপাশি দেশের রপ্তানির পরিমাণ এবং পোশাকের গড় দাম—দুটিই একযোগে উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
জানুয়ারি-জুন সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইইউতে পোশাক রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ৮.২২ শতাংশ। একই সময়ে পোশাকের গড় দাম কমেছে ৮.৯৪ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা একদিকে কম পরিমাণ পোশাক রপ্তানি করেছেন, অন্যদিকে সেই পোশাক বিক্রি করতে হয়েছে তুলনামূলক কম দামে। এর আগে জানুয়ারি-মে সময়েও বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ১৮.৮৯ শতাংশ কমেছিল।
প্রতিযোগীদের অবস্থাও খারাপ, তবে ভিয়েতনামের ব্যতিক্রমী শিক্ষা
ইইউর বাজারে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর রপ্তানিও সামগ্রিকভাবে নিম্নমুখী। প্রথম ছয় মাসে চীনের পোশাক রপ্তানি কমেছে ৮.৮৮ শতাংশ, তুরস্কের ১৪.৬০ শতাংশ, ভারতের ১২.৪৯ শতাংশ, পাকিস্তানের ১২.৫৩ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার ১১.২১ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার ৮.৮৪ শতাংশ।
তবে এই মন্দার মধ্যেও নজর কাড়ছে ভিয়েতনামের পারফরম্যান্স। ছয় মাসে দেশটির পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ১১.৫২ শতাংশ কমলেও পোশাকের গড় দাম বেড়েছে ১৩.৪৩ শতাংশ। ফলে কম পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করেও দাম বেশি পাওয়ার কারণে ভিয়েতনামের মোট রপ্তানি আয় ০.৩৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কম দামে বেশি পণ্য বিক্রির পুরোনো কৌশলে না গিয়ে ভ্যালু এডেড পণ্যে নজর দেওয়ার কারণে ভিয়েতনাম সুবিধাজনক স্থানে রয়েছে।
| দেশ | রপ্তানি আয় বৃদ্ধি/পতন (%) | পরিমাণের পরিবর্তন (%) | গড় দামের পরিবর্তন (%) |
| বাংলাদেশ | -১৬.৪৩% | -৮.২২% | -৮.৯৪% |
| চীন | -৮.৮৮% | — | — |
| ভিয়েতনাম | +০.৩৬% | -১১.৫২% | +১৩.৪৩% |
| তুরস্ক | -১৪.৬০% | — | — |
| ভারত | -১২.৪৯% | — | — |
জুনে সামান্য স্বস্তি, কাটেনি শঙ্কা
ছয় মাসের সামগ্রিক চিত্র হতাশাজনক হলেও জুনে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখা গেছে। জুনে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি গত বছরের একই মাসের তুলনায় ০.৮৭ শতাংশ বেড়ে ১.৩৭ বিলিয়ন ইউরো হয়েছে। এ সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ৬.৫৩ শতাংশ বাড়লেও পোশাকের গড় দাম কমেছে ৫.৩১ শতাংশ। অর্থাৎ বেশি পরিমাণ পোশাক পাঠিয়েও দাম কম পাওয়ায় রপ্তানি আয়ে বড় কোনো উল্লম্ফন ঘটেনি।
বিশেষজ্ঞ ও শিল্প উদ্যোক্তাদের মত
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল পরিস্থিতি বিশ্লেষণে বলেন, “ইইউর বাজারে সামগ্রিক আমদানি কমার চেয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি কমার হার অনেক বেশি। সবচেয়ে বড় সতর্কসংকেত হচ্ছে—আমাদের রপ্তানির পরিমাণ এবং ইউনিট মূল্য দুটিই একযোগে কমে গেছে। ভিয়েতনামের দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা কম পণ্য পাঠিয়েও বেশি দামে বিক্রি করে আয় ধরে রাখতে পেরেছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের শুধু কম দাম দিয়ে অর্ডার ধরে রাখার মানসিকতা থেকে বের হতে হবে। কৃত্রিম তন্তু, উন্নত প্রযুক্তি ও উচ্চমূল্যের পোশাক রপ্তানির দিকে নজর দিতে হবে। পাশাপাশি এলডিসি উত্তরণের বিষয়টি মাথায় রেখে পণ্যের বৈচিত্র্য ও কারখানার সক্ষমতা না বাড়ালে ইউরোপের সাময়িক এই মন্দা বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে বাজার হারানোর ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।”


