Homeঅর্থনীতি৬৭.১% দরিদ্রই সামাজিক নিরাপত্তার বাইরে

বাড়ছে বৈষম্য
৬৭.১% দরিদ্রই সামাজিক নিরাপত্তার বাইরে

দেশে দারিদ্র্য ও বৈষম্য আশঙ্কাজনকভাবে বাড়লেও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সরকারি ব্যয় অত্যন্ত অপ্রতুল। বিপুলসংখ্যক সরকারি কর্মসূচি চালু থাকা সত্ত্বেও প্রকৃত দরিদ্রদের বড় অংশ সহায়তার সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকছে। বিপরীতে, দরিদ্র নয় এমন মানুষও নানাভাবে এই সহায়তার সুবিধা পাচ্ছে। একই সঙ্গে শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার উচ্চ হার দেশের মানবসম্পদ তৈরিতে বড় ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। এ পরিস্থিতিতে দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক সুরক্ষা ও শিক্ষা—এই তিন খাতেই বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কারের তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘এসডিজি অর্জনে পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো: নীতি, অংশীদারত্ব ও অগ্রাধিকার’ শীর্ষক জাতীয় সম্মেলনে সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এই চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন জিইডির সদস্য ড. মনজুর হোসেন ও উপপ্রধান মোহাম্মদ ফাহিম আফসান চৌধুরী।

দরিদ্ররা বাদ, সুবিধা পাচ্ছে অ-দরিদ্ররা

প্রতিবেদনে দেখা যায়, দারিদ্র্যকেন্দ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বাংলাদেশে ব্যয় জিডিপির মাত্র ০.৯ শতাংশ, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার গড় ৩.৮ শতাংশ। ২০২২ সালে দেশে মাঝারি দারিদ্র্যের হার ১৮.৭ শতাংশ এবং চরম দারিদ্র্য ৫.৬ শতাংশে নামলেও ২০২৫ সালে তা বেড়ে যথাক্রমে ২৭.৯৩ শতাংশ এবং ৯.৩৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিবেদনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বাদ পড়ার হার ৬৭.১ শতাংশ। বিধবা ভাতার ক্ষেত্রে এই বাদ পড়ার হার প্রায় ৮৫ শতাংশ। অথচ বর্তমান সুবিধাভোগীদের ৬২.৮ শতাংশই দরিদ্র বা ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত নয়।

সামাজিক সুরক্ষার অর্থায়ন বর্তমানে ৯৫টি কর্মসূচিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ছোট ৫০টি কর্মসূচির পেছনে ব্যয় হয় মোট বরাদ্দের মাত্র ২.৩ শতাংশ, যা প্রশাসনিক ব্যয় ও সমন্বয়হীনতা বাড়াচ্ছে। শহরাঞ্চলেও বৈষম্য প্রকট; ১৪০টি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মধ্যে মাত্র ২৩টি শহরের দরিদ্রদের জন্য পরিচালিত হয় এবং মোট বাজেটের মাত্র ৪ শতাংশ শহরের জন্য বরাদ্দ থাকে। ফলে মূল্যস্ফীতিতে পিষ্ট শহরের অনানুষ্ঠানিক খাতের দরিদ্ররা সুরক্ষাহীন পড়ে রয়েছে।

কর্মসূচি কমানো ও নতুন পরিকল্পনার আশ্বাস

অনুষ্ঠানে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি জানান, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীন থাকা ৯০টির বেশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি কমিয়ে ১০টির নিচে আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’-এর মাধ্যমে সুবিধাভোগী নির্বাচন সর্বজনীন ও স্বচ্ছ করা হবে, যাতে রাজনৈতিক প্রভাবে অ-দরিদ্রদের তালিকায় ঢোকার সুযোগ বন্ধ হয়। তিনি বলেন, “কেউ যেন বাদ না পড়ে, সেটাই আমাদের মূল নীতি।”

এ ছাড়া সরকার একটি ‘সোশ্যাল সেফটি ফ্লোর’ চালুর পরিকল্পনা করছে। ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ সর্বোচ্চ চার কোটি পরিবারে সম্প্রসারণ করে পরিবারের নারী প্রধানকে মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সরাসরি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে বড় ধরনের চিকিৎসা খরচের কারণে কোনো পরিবার যাতে নতুন করে দরিদ্র না হয়ে পড়ে, সে জন্য সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকার চিকিৎসা সুরক্ষা তহবিল গঠনের চিন্তাভাবনা চলছে।

প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, বর্তমানে বাজেটে শিক্ষায় জিডিপির ২ শতাংশ এবং স্বাস্থ্যে ১ শতাংশ বরাদ্দ রয়েছে, যা ভবিষ্যতে বাড়িয়ে ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।

বৈষম্য ও রাজস্ব কাঠামোর সংকট

প্রতিবেদনে দেশের আয়বৈষম্যের একটি ভয়াবহ রূপ ফুটে উঠেছে। ২০২২ সালে দেশের ‘গিনি সহগ’ (বৈষম্য পরিমাপক) ছিল ০.৪৯৯ এবং শহরাঞ্চলে ছিল ০.৫৩৯। তথ্য অনুযায়ী, দেশের শীর্ষ ১০ শতাংশ পরিবারই মোট আয়ের ৪১ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। অন্যদিকে, সরকারের রাজস্ব আয়ের ৬৬.৭ শতাংশই আসে পরোক্ষ কর থেকে, যার মূল চাপ পড়ে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর। ব্যাংকিং খাতে ২০২৩ সালে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৯.৫৭ শতাংশ।

এই পরিস্থিতি উত্তরণে সরকার নতুন ঝুঁকিতে পড়া জনগোষ্ঠীর সহায়তায় ডিজিটাল সামাজিক নিবন্ধন, একক নাগরিক পরিচয় ও সরাসরি অর্থ স্থানান্তরের পদক্ষেপ নিচ্ছে।

‘শিক্ষার সিস্টেম লস জাতির জন্য চরম ভয়াবহ’

একই অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে শিক্ষার্থী ঝরে পড়াকে ‘সিস্টেম লস’ হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ খাতের সিস্টেম লসে কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, কিন্তু শিক্ষার সিস্টেম লস পুরো জাতির ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দেয়। ঝরে পড়া তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে না পারলে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ একসময় বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

শিক্ষামন্ত্রী জানান, দেশে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৩৮ হাজার প্রধান শিক্ষক এবং স্কুল-কলেজে প্রায় ৭৭ হাজার শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। শিক্ষা খাতের বাজেট ৮৭ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে, এখন এই অর্থের সঠিক ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

অন্য এক অধিবেশনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, কেবল ওষুধ বা স্যালাইন সরবরাহ করে স্বাস্থ্য খাতের এসডিজি অর্জন করা সম্ভব নয়; রোগ প্রতিরোধকে মূল ভিত্তি বানিয়ে পানি, শিক্ষা ও স্থানীয় সরকারের মতো খাতগুলোকে নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য