কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের দমদমিয়া এলাকার ‘১৪ নম্বর ব্রিজ’ এখন অপরাধের এক প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। নাফ নদী ও দুর্গম পাহাড়ে ঘেরা হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে এলাকাটিতে ডাকাতি, অপহরণ, ছিনতাই, খুন ও ইয়াবা পাচারের ঘটনা ঘটে চলেছে। সম্প্রতি দিনদুপুরে যাত্রীবাহী বাস থামিয়ে বিকাশ এজেন্টের দুই কর্মীর কাছ থেকে ৫৭ লাখ টাকা লুটের পর এলাকাটি নিয়ে নতুন করে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, লুট হওয়া সেই অর্থের একটি অংশ অস্ত্র কেনার উদ্দেশ্যে ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল দুর্বৃত্তদের।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর আগে এই ব্রিজ থেকে মাত্র ১০০ গজ দূরে ১৮ লাখ ৩৬ হাজার টাকা লুট হয়েছিল, যার আজও সুরাহা হয়নি। বারবার এমন ঘটনায় স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ চালকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
পিচঢালা পথে দিনের আলোতেই ত্রাস
কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কে দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে গাড়ি চালানো এক বাসচালক জানান, স্থলবন্দরের কাছের এই ১৪ নম্বর ব্রিজ চালক ও যাত্রীদের কাছে এক আতঙ্কের নাম। দমদমিয়া বিজিবি চেকপোস্টের কাছে এবং কোস্টগার্ড টেকনাফ স্টেশনের সামান্য দূরত্বে অবস্থান হওয়া সত্ত্বেও দিন-দুপুরে সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে ও পেরেকযুক্ত কাঠ বিছিয়ে গাড়ি থামানো হয়। কয়েক মিনিটের মধ্যে অস্ত্রধারীরা লুটপাট চালিয়ে পাশের গহিন পাহাড়ে গা-ঢাকা দেয়।
সর্বশেষ গত ২ আগস্টের ৫৭ লাখ টাকা লুটের ঘটনাটিতেও একই কৌশল ব্যবহার করা হয়। বিজিবি ও পুলিশের তল্লাশি এড়িয়ে একটি অটোরিকশায় থাকা বোরকা পরা এক নারী সংকেত দিলে পাহাড়ি জঙ্গল থেকে ৭-৮ জনের এক দল ডাকাত সড়কে নেমে এসে মাত্র ১৫ মিনিটে পুরো কাজ শেষ করে পালায়।
ডাকাত ‘আক্তার-আলম’ চক্রের দাপট
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকার কুখ্যাত ডাকাত শফির সাবেক সহযোগী আক্তার ও মো. আলমের নেতৃত্বে ২০-২৫ জনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র এই অঞ্চলে সক্রিয়। তাদের সংগ্রহে দেশি ও অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। এই দলের সদস্যরা হ্নীলা ইউনিয়নের লেদাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার বাসিন্দা এবং তাদের দলে একাধিক রোহিঙ্গা সদস্য রয়েছে।
ইতোমধ্যে চাঞ্চল্যকর এই ৫৭ লাখ টাকা লুটের মামলায় পুলিশ মো. আক্তার হোসেন, সিএনজি অনুসারী নারী রূপবাহার এবং এক রোহিঙ্গাসহ মোট ৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। টেকনাফের বিচারিক হাকিম আদালতে দুই আসামি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে। পুলিশ এ পর্যন্ত দুই লাখ ২৬ হাজার ৭০০ টাকা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে।
অস্ত্র কিনতেই এই বিপুল টাকা লুট
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. অহিদুর রহমান জানান, “গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা, মাদক ও ডাকাতির একাধিক মামলা রয়েছে। তদন্তে জানা গেছে, লুট করা অর্থের একটি বড় অংশ নতুন আগ্নেয়াস্ত্র কেনার কাজে ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল। ডাকাতদের আয়ের মূল উৎস মাদক, মানবপাচার ও ডাকাতি।”
টেকনাফ মডেল থানার ওসি সাইফুল ইসলাম জানান, ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের চিহ্নিত করা গেছে এবং বাকিদের গ্রেপ্তার ও সমুদয় টাকা উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে দ্রুত সময়ের মধ্যে পাহাড়ি অপরাধীদের এই স্থায়ী ঘাঁটি ধ্বংস না করলে সীমান্ত এলাকার সার্বিক বাণিজ্যিক ও জননিরাপত্তা মারাত্মক হুমকিতে পড়বে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।


