Homeজাতীয়৪১ বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ, গ্রামে তীব্র লোডশেডিং

গ্যাস ও কয়লা সংকট
৪১ বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ, গ্রামে তীব্র লোডশেডিং

চরম জ্বালানি সংকট ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কারণে দেশের ৪১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ হয়ে পড়েছে। চালু থাকা কেন্দ্রগুলোও জ্বালানির অভাবে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে রাজধানীতে ক্ষণে ক্ষণে লোডশেডিং হলেও গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকাগুলোতে দিন-রাতে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎ মিলছে না। একদিকে তীব্র দাবদাহ, অন্যদিকে অসহনীয় বিদ্যুৎ বিভ্রাটে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে শিল্পাঞ্চলগুলোতে উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হওয়ায় অতিরিক্ত জেনারেটর পরিচালনায় বাড়ছে উৎপাদন খরচ।

বিতরণ কোম্পানির সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ের লোডশেডিং অতীতের সব রেকর্ড অতিক্রম করেছে। গড়ে দৈনিক প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি থাকছে। গত রোববার বিকেল ৩টায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট রেকর্ড করা হয়। কিন্তু মাত্র ১০ ঘণ্টার ব্যবধানে রাত ১টায় তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে, যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ।

গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন তলানিতে

বিদ্যুৎ সংকটের মূল উৎস গ্যাসের ভয়াবহ ঘাটতি। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ২৫২ কোটি ঘনফুট। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অন্তত ১০০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৭০ কোটি ঘনফুট। ফলে একসময় যেখানে গ্যাস থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি বিদ্যুৎ উৎপাদিত হতো, তা এখন সাড়ে তিন থেকে চার হাজার মেগাওয়াটে নেমে এসেছে।

সংকট আরও জোরালো হয় গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর। সেখান থেকে দৈনিক প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ কমে গিয়ে দৈনিক মোট গ্যাস সরবরাহ ২১৪ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে। তবে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) প্রকৌশলী মো. শোয়েব জানান, চলতি সপ্তাহের মধ্যেই টার্মিনালটি পুরোপুরি মেরামত শেষে আরও ৩০ থেকে ৩৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।

কয়লা ও আমদানি বিদ্যুতে টান

বিদ্যুৎ সংকট বাড়িয়েছে কয়লা সরবরাহে তৈরি হওয়া জটিলতা। ১,২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার পটুয়াখালী তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন অর্ধেকের বেশি কমেছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে কুতুবদিয়ায় বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে কয়লা খালাসে অতিরিক্ত সময় লাগছে।

অপরদিকে ভারতের ঝাড়খণ্ডে বন্যার কারণে কয়লা ভিজে যাওয়ায় সেখান থেকে আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎ সরবরাহ ১,৪০০ মেগাওয়াট থেকে কমে ৮০০ থেকে ১,০০০ মেগাওয়াটে ঠেকেছে। দেশে বর্তমানে প্রায় ৭,৯৪৫ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ সক্ষমতার বিপরীতে উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট। তা ছাড়া রামপাল ও বড়পুকুরিয়ার কারিগরি জটিলতায় নিজস্ব উৎপাদনও হ্রাস পেয়েছে।

সাময়িক সমাধান ও বিশেষজ্ঞ মতামত

গ্যাস ও কয়লা ঘাটতি মেটাতে সরকার এখন ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে, তবে বকেয়া না পাওয়ায় বেসরকারি তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর জ্বালানি আমদানিতেও নতুন সংকট দেখা দিয়েছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম আশা প্রকাশ করে জানান, এলএনজি সরবরাহ ও আদানি পাওয়ারের কয়লা প্রাপ্তি সহজ হলে আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম মনে করেন, এই সংকট দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, এলএনজি-নির্ভরতা ও দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের অভাবেরই ফল। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও অপচয় রোধ ছাড়া এই সংকট থেকে পুরোপুরি উত্তরণ সম্ভব নয়।

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য