পতনের শঙ্কা আগামী ১২ থেকে ২৪ মাসের মধ্যে; ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ও প্রবৃদ্ধি মন্থর হওয়াকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত
দীর্ঘস্থায়ী ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মন্থরগতির জেরে বাংলাদেশের সার্বভৌম ঋণমানের (সভরেন ক্রেডিট রেটিং) পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’ থেকে কমিয়ে ‘নেতিবাচক’ (Negative) করেছে আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠান ‘এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল’। সোমবার সংস্থাটির প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই পূর্বাভাস ব্যক্ত করে বলা হয়, আগামী ১২ থেকে ২৪ মাসের মধ্যে সামষ্টিক পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হলে বাংলাদেশের ক্রেডিট রেটিং আরও এক ধাপ নামিয়া যাইতে পারে।
অবশ্য এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সার্বভৌম ঋণমান ‘বি প্লাস’ (B+) এবং স্বল্পমেয়াদি ঋণমান ‘বি’ (B) অপরিবর্তিত রাখিয়াছে। এর আগে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সংস্থাটি বাংলাদেশের ঋণমান ‘বিবি মাইনাস’ থেকে এক ধাপ কমিয়ে ‘বি প্লাস’ করেছিল।
বিশ্বের তিন শীর্ষ ক্রেডিট রেটিং সংস্থা- এসঅ্যান্ডপি, মুডি’স এবং ফিচ রেটিংস (যা একত্রে ‘বিগ থ্রি’ নামে পরিচিত)- এর মধ্যে এসঅ্যান্ডপির এই সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক বিনিয়োগে নতুন করিয়া চাপ সৃষ্টি হইতে পারে বলিয়া আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
এসঅ্যান্ডপির মূল্যায়ন ও পূর্বাভাসের মূল দিকগুলো:
- জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয়: দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া জটিল আকার ধারণ করায় আগামী তিন বছরে বাংলাদেশের গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.৫ শতাংশে সীমিত থাকিতে পারে। ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় দাঁড়াইয়াছে প্রায় ২,৭৫০ ডলার। গত ১০ বছরে গড় প্রকৃত মাথাপিছু জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৩ শতাংশে নামিয়া আসিয়াছে, যাহা ২০২২ সালে ছিল ৫.৮ শতাংশ।
- ব্যাংক খাত ও জ্বালানি সংকট: খেলাপি ঋণের উচ্চ হার ও দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন কার্যক্রম আশানুরূপ সুফল না দেওয়ায় অভ্যন্তরীণ ভোগ সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হইতেছে। জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে মূল্যস্ফীতিও এখনো চড়া।
- রপ্তানি ও শুল্কের অনিশ্চয়তা: বৈশ্বিক চাহিদার মন্দার কারণে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি ২.৬ শতাংশ কমিয়াছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য শুল্ক নীতি লইয়া অনিশ্চয়তা দেখা দিয়াছে।
- রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সম্ভাবনা: ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিপুল জনসমর্থন লইয়া ক্ষমতায় আসার পর নীতিনির্ধারণে অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হইয়াছে, যাহা নীতিগত সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য সহায়ক হইতে পারে।
- আশার আলো ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ: সংস্থাটি আরও জানায়, দেশে প্রবাসী আয়ের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি (১৯ শতাংশ বৃদ্ধি), তৈরি পোশাক খাতের সম্ভাব্য পুনরুদ্ধার এবং আইএমএফসহ বহুপক্ষীয় ঋণদাতাদের ধারাবাহিক সহায়তায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়িয়া ৩২.৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাইয়াছে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন বলেন, “এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক ঋণদাতা ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহের খরচ কিছুটা বাড়াইতে পারে। তবে আগামী ১২ থেকে ২৪ মাসের মধ্যে আর্থিক খাতের গতি বাড়াইয়া পূর্বাভাস ইতিবাচক করিবার এটি একটি বড় সুযোগ ও বার্তা।”
অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর ও খেলাপি ঋণ কমাইতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানামুখী পুনর্গঠন ও এক্সিট পলিসি বাস্তবায়ন করিতেছে। ব্যবসায়িক গতি ফেরাইতে ইতোমধ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করা হইয়াছে, যাহা অর্থনীতির চাকা সচল করিতে কার্যকর ভূমিকা রাখিবে।


