মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে দেশে তীব্র গ্যাসসংকট দেখা দিয়েছে। জাতীয় গ্যাস গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক, শিল্প, বাণিজ্যিক ও সিএনজি খাতে গ্যাসচাপ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রভাব পড়েছে। ব্যাহত হচ্ছে শিল্প-কারখানার কার্যক্রমও। সিএনজি স্টেশনে গ্যাস না পেয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ করে আন্দোলনও করেছেন চালকরা।
গতকাল বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন সিএনজি স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, ভোর থেকেই গ্যাস নিতে শত শত সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে।
অনেক চালক অভিযোগ করেন, তিন থেকে চার ঘণ্টা অপেক্ষা করেও পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। ফিলিং স্টেশন মালিকরা জানান, জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের চাপ কম থাকায় স্বাভাবিক গতিতে গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে প্রতিটি গাড়িতে গ্যাস নিতে আগের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগছে। কোথাও সীমিত পরিমাণে গ্যাস দেওয়া হচ্ছে, আবার কিছু স্টেশন সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
গ্যাসসংকটের প্রতিবাদে গতকাল দুপুরে রাজধানীর খিলক্ষেতে বিমানবন্দর সড়ক অবরোধ করেন সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকরা। এতে ওই এলাকায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। অবরোধে অংশ নেওয়া চালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও গ্যাস পাইনি। এতে আমাদের দৈনিক আয় ব্যাহত হচ্ছে। জমা ও অন্যান্য খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।গ্যাস সংগ্রহ করতেই দিনের বেশির ভাগ সময় চলে যাচ্ছে।’
সরেজমিনে দেখা গেছে, শতাধিক চালক সড়কে অবস্থান নিয়ে দ্রুত গ্যাসসংকট নিরসনের দাবি জানান। খিলক্ষেত থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।
গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় আবাসিক গ্রাহকদের চুলায় আগুন জ্বলছে না। কোথাও কোথাও গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। হোটেল, রেস্তোরাঁ, বেকারি ও ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও স্বল্প চাপের কারণে স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছে। শিল্পাঞ্চলের অনেক কারখানায় প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপ না থাকায় উৎপাদন কমিয়ে দিতে হয়েছে। এতে রপ্তানিমুখী শিল্পেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এদিকে গতকাল সচিবালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব (অপারেশন) মনির হোসেন চৌধুরী জানান, মন্ত্রণালয় গ্যাসসংকটের বিষয়টি স্বীকার করে জানিয়েছে, দুটি এফএসআরইউর একটিতে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সাময়িকভাবে গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। কারিগরি বিশেষজ্ঞরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে মেরামতের কাজ করছেন। এটি সাময়িক সমস্যা। দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বর্তমানে দেশে গ্যাসের মোট চাহিদা প্রায় তিন হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট, অথচ সরবরাহ করা যাচ্ছে দুই হাজার ৭০০ থেকে দুই হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এই ঘাটতি দীর্ঘদিনের হলেও সরকার তা কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।
মনির হোসেন চৌধুরী আরো জানান, বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি হলেও দীর্ঘদিনের আমদানিনির্ভরতা পরিস্থিতি আরো জটিল করেছে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন পর্যাপ্ত না হওয়ায় এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ফলে আমদানি অবকাঠামোর কোনো অংশে সমস্যা দেখা দিলেই জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা চাপে পড়ে। এই নির্ভরতা কমাতে সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে পর্যায়ক্রমে ১০০টি নতুন গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে একনেক সভায় নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ এবং সুনামগঞ্জে ৭২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি নতুন গ্যাসকূপ খনন প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে।
জ্বালানি তেলের সংকট নেই : দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই বলে জানিয়েছেন যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জ্বালানি তেলের সংকট নিয়ে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে দেশে ৩১ দিনের ডিজেল, ৩৬ দিনের অকটেন, ২০ দিনের পেট্রল, ২৫ দিনের ফার্নেস অয়েল এবং ২০ দিনের জেট ফুয়েলের মজুদ রয়েছে। ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে আরো এক লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল দেশে পৌঁছবে এবং আগস্টে আসবে আরো দুই লাখ ৪০ হাজার টন ডিজেল। ফলে আগামী কয়েক সপ্তাহ জ্বালানি তেলের কোনো সংকটের আশঙ্কা নেই।’


