ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজের শেষ আলোটুকু ছড়াতে নেমেছিলেন লিওনেল মেসি। একটি অবিস্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দেবেন- এমন প্রত্যাশা ছিল কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর। কিন্তু নিউ জার্সি স্টেডিয়ামের পশ্চিম গ্যালারির পেছনে সূর্য যখন হেলে পড়ছিল, তখন ক্রমশই স্পষ্ট হতে থাকে, টুর্নামেন্টজুড়ে মেসির পায়ে যে জাদু, সেটি হঠাৎ উধাও। স্পেন ধীরে ধীরে যখন ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিচ্ছিল, তখন কঠিন এক বাস্তবতার মুখোমুখি আর্জেন্টিনা। ১-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে তারা যেন সমস্ত আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছেন।
টুর্নামেন্টের আগের ম্যাচগুলোতে যে আর্জেন্টিনা বা যে মেসিকে আমরা দেখেছি, ফাইনালের ম্যাচে সেই দলটির চেহারা সম্পূর্ণ বিপরীত। দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর দল ছিল এই আর্জেন্টিনা। প্রতিপক্ষকে কীভাবে ধূলিসাৎ করা যায়, সেটি তাদের জানা। তার চেয়ে বড় কথা, গোল করার সঠিক সময় নিখুঁতভাবে নির্বাচন করতে তারা সিদ্ধহস্ত। সে অভিজ্ঞতা দিয়েই দুটি ম্যাচে অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিপক্ষের কাছে হেরে যাওয়ার মুখ থেকে ফিরে তারা ট্রফি জয়ের দৌড়ে নিজেদের শক্তিশালী করে তোলে।
বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচগুলো বরাবরই নীরস হয়। তবে সেই মানদণ্ডেও এবারের ফাইনালের গতি ও ধরণ হতাশাজনক। প্রথমার্ধের পারফরম্যান্সের পর দ্বিতীয়ার্ধে স্প্যানিশ রক্ষণভাগ ধীরে ধীরে ম্যাচের লাগাম টেনে ধরে। অতিরিক্ত সময়ে গিয়ে তারা কাঙ্ক্ষিত গোল পেয়ে যায়, যা ছিল একেবারেই প্রত্যাশিত।
কিন্তু আর্জেন্টিনা? বিশ্বকাপের প্রায় শতবছরের ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে ফাইনাল ম্যাচের নির্ধারিত ৯০ মিনিটে প্রতিপক্ষের গোলপোস্টে একটি শটও তারা নিতে পারেনি! এমনকি অতিরিক্ত ৩০ মিনিট পাওয়ার পরও তারা স্পেনের জন্য সামান্যতম হুমকি তৈরি করতে পারেনি।
আর লিওনেল মেসি? ফাইনালের আগ পর্যন্ত বিশ্ব ফুটবলকে দারুণ কিছু দেখার সুযোগ করে দিয়েছেন তিনি। কোনো ধরনের চাপ ছাড়াই সেটি তার স্বাভাবিক ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রকাশ। ৩৯ বছর বয়সে এসে মেসির অর্জনের খাতা এতটাই পরিপূর্ণ যে- ব্যক্তিগত, ক্লাব বা জাতীয় দলের হয়ে তার অর্জন নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস কারও নেই। রোববার রাতের পরাজয় তার সেই ক্যারিয়ারে সামান্য আঁচড় কাটবে না, সেটি ঠিক। তবে ম্যাচটি জিতলে সর্বকালের সেরা ফুটবলার হিসেবে তার অবস্থান আরও শক্তিশালী হতো- এটি বলা যায় নির্দ্বিধায়।
দিনশেষে এ সত্যটাও স্বীকার করতে হবে, গোটা টুর্নামেন্টে যে মেসি একাই দলকে টেনেছেন, ফাইনালের পুরো ম্যাচে তার উপস্থিতি নগন্য। এর বড় কারণ অবশ্যই স্প্যানিশ রক্ষণভাগের মাস্টারক্লাস পারফরম্যান্স। তবে কেবল রক্ষণ দিয়ে তো আর্জেন্টিনা অধিনায়ককে আটকে রাখা সবসময় সম্ভব নয়। তাই সবদিক থেকে আর্জেন্টিনাকে পরিষ্কার টেক্কা দিয়েছে স্পেন, মেসিকেও নিষ্ক্রিয় করে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

মাঠে মেসির কাছে সময় বরাবরই একটি আপেক্ষিক বিষয়। কারণ প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের বোকা বানাতে তিনি নিজের মতো করে সময়ের গতি যখন-তখন আটকে দিতে পারেন। তাই এই বয়সে এসেও তিনি সময়ের দেয়াল ভেঙে দর্শকদের নিয়ে গেছেন বার্সেলোনায় কাটানো সেই সোনালি দিনগুলোতে। অনেকে মনে করেন, সময় মেসিকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি, বরং তিনি সময়ের পাশাপাশি হেঁটেছেন। কখনও হয়তো দু-এক কদম পিছিয়ে পড়েছেন, কিন্তু আবার তা পুনরুদ্ধার করেছেন।
কিন্তু ফাইনাল ম্যাচটি আমাদের একটি বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। মেসি অধ্যায়ের কী সমাপ্তি ঘটল? যদিও তাকে নিয়ে এমন সংশয়ের কথা বলা হয়েছিল ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জেতানোর পর, আবার ২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পর মেসি যখন ক্ষোভে জাতীয় দল থেকে সাময়িক অবসর নেন, সেই সময়।
তখনকার দিনে আলোচনা হতো, বার্সেলোনার হয়ে মেসি যেভাবে খেলেন, আর্জেন্টিনার হয়ে ঠিক সেভাবে খেলতে পারেন না। এমনকি জীবনের বড় একটি অংশ স্পেনে কাটানোর কারণে তিনি ‘যথেষ্ট আর্জেন্টাইন’ নন বলেও গুঞ্জন ছিল। ঠিক ১০ বছর পর সেই বিতর্ককে কেবল কৌতুকই মনে হয়েছে।
আর্জেন্টিনার হতাশাজনক পারফরম্যান্স দেশের মানুষ কীভাবে গ্রহণ করবে, তা সময়ই বলে দেবে। কেননা তাদের প্রত্যাশার পারদ ছিল আকাশচুম্বী। ফাইনাল ম্যাচের আগে অবশ্য প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনি, এমনকি মেসি নিজেও দীর্ঘ আলাপে জানিয়েছেন, তারা এই টুর্নামেন্টে এরইমধ্যে যতটা অর্জন করেছেন তাতেই তৃপ্ত। দুজনের কথার সুরে এমনটাই ইঙ্গিত ছিল- ফাইনালের ফলাফল তাদের সাফল্যগাথাকে কোনোভাবেই ম্লান করতে পারবে না। তবে সেগুলো ছিল মাঠে নামার আগের কথা।
মেসির মতোই স্কালোনির গৌরবোজ্জ্বল ক্যারিয়ার এই ফাইনালের আগেই নিশ্চিত হয়ে গেছে। আর্জেন্টিনাকে তৃতীয় বিশ্বকাপ এবং টানা দুটি কোপা আমেরিকা ট্রফি উপহার দেওয়া কোচ তিনি। তবু এই ফাইনাল ছিল তার সেই সাম্রাজ্যকে আরও সুদৃঢ় করার সুযোগ। দুটি সত্য এখানে পাশাপাশি, স্কালোনি নিঃসন্দেহে আর্জেন্টিনার ইতিহাসে অন্যতম সেরা কোচ, একই সঙ্গে এটি তার ক্যারিয়ারের অন্যতম বাজে ফলাফল।
সবকিছুর ঊর্ধ্বে এখন স্পষ্ট হলো- গভীর এক হতাশা। আর্জেন্টিনা ও মেসির রূপকথাকে নিখুঁত সমাপ্তি দিতে না পারার কষ্ট। সোনালি সুযোগ কাজে লাগানো তো দূরের কথা, মাঠের পারফরম্যান্সে তারা পুরো গল্পের খলনায়ক।


