ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধের পরিধি আরো বিস্তৃত করে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ আরোপের ঘোষণা দিয়েছে ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুথি বিদ্রোহীরা।সোমবার দেয়া এ ঘোষণায় উপসাগরের বাইরে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতেও নতুন যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর চলমান চাপ আরো বাড়তে পারে।
হুথিদের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইয়েমেনের ওপর সৌদি আরবের কথিত ‘অন্যায্য ও নিপীড়নমূলক অবরোধের’ জবাবে অবিলম্বে এ সামুদ্রিক অবরোধ কার্যকর হবে। তারা একে ‘চোখের বদলে চোখ’ নীতির প্রয়োগ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে হুথিদের ঘোষণার বিষয়ে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা অব্যাহত রাখলে বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দিতে হুথিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল তেহরান। লোহিত সাগরের প্রবেশপথ হিসেবে পরিচিত এ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্বের প্রায় ৭ শতাংশ তেল সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে সৌদি আরবের অধিকাংশ তেল রফতানির পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। উপসাগরীয় যুদ্ধে এরই মধ্যে বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ১০ শতাংশ সমপরিমাণ তেল পরিবহন কমে গেছে।
যুদ্ধ সম্প্রসারণের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান নতুন করে কূটনীতিতে ফেরার আগ্রহ দেখিয়েছে। ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত মাসে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী সমঝোতা রক্ষায় মধ্যস্থতাকারীরা তেহরানকে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধের আলোচনার পথ তৈরিই ছিল ওই সমঝোতার লক্ষ্য।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, কয়েকজন মধ্যস্থতাকারীর পক্ষ থেকে সম্প্রতি বিভিন্ন প্রস্তাব পাওয়া গেছে এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ এখনো সক্রিয় রয়েছে। তবে সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির শর্ত বা আলোচনার বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। পাকিস্তানের দুই সরকারি সূত্র জানিয়েছে, ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনি এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে দ্বিতীয়বার ইসলামাবাদ সফরে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে পাকিস্তানকে পুনরায় মধ্যস্থতা শুরু করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেও হামলা-পাল্টা হামলা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র টানা নবম রাতের মতো ইরানের বিভিন্ন শহরে বিমান হামলা চালিয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার সক্ষমতা দুর্বল করাই এসব অভিযানের লক্ষ্য। ইরানের তাবরিজ, চাবাহার, কোনারাক, বন্দর মাহশাহর ও বন্দর ইমাম খোমেনিতে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। তাবরিজের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে হামলায় একজন নিহত এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড জানিয়েছে, জর্ডানের আকাবা বিমানবন্দরে মার্কিন সামরিক উড়োজাহাজ, কুয়েতের আল-আদিরি ক্যাম্প ও আলি আল সালেম বিমানঘাঁটি এবং সিরিয়ায় মার্কিন অবস্থান লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। বাহরাইনে সোমবার বিভিন্ন সময়ে সতর্কতামূলক সাইরেন বেজেছে। কুয়েতের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা আবারো ইরানি ড্রোন প্রতিহত করেছে।
কুয়েত সরকার জানিয়েছে, দেশটির একটি লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো হামলা হয়েছে। এতে আগুন ধরে যায়। হামলাটিকে গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর সরাসরি আঘাত বলে উল্লেখ করেছে কুয়েত। মরুপ্রধান উপসাগরীয় দেশগুলোয় কোটি মানুষের পানীয় জলের প্রধান উৎস এসব বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র।
হরমুজ প্রণালিতেও জাহাজ চলাচল ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড দাবি করেছে, ‘অনিরাপদ’ পথ দিয়ে প্রণালি অতিক্রমের সময় দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে বিস্ফোরণ ঘটেছে। তবে জাহাজগুলোর পরিচয়, ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের তথ্য জানানো হয়নি।
এদিকে ওমান উপকূলের কাছে অজ্ঞাত একটি প্রজেক্টাইলের আঘাতে আরেকটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জাহাজটি নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় ভাসলেও নাবিকরা নিরাপদে রয়েছেন।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ইরান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে হামলা অব্যাহত রাখলে যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা হামলা চালিয়ে যাবে। তবে কূটনৈতিক সমাধানের দরজা খোলা রয়েছে বলে জানান তিনি। ইরানও আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেনি। কিন্তু নতুন নৌ অবরোধের ঘোষণায় যুদ্ধ এখন হরমুজ থেকে বাব আল-মান্দেব পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।


