আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ইরানের নির্মাণাধীন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে মার্কিন হামলাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে বড় মাপে সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। স্থানীয় সময় রবিবার ভোর ৩টা ৩৯ মিনিটে এ স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। এর আগে ইরানের এক হামলায় কুয়েতে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পানি শোধনাগারে আগুন ধরে যায়। আরেক খবর অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে নিহত মার্কিন সেনার সংখ্যা বেড়ে ১৬ জনে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া ৪৩০ জনের বেশি সেনা আহত হয়েছেন। এখনো একজন নিখোঁজ রয়েছেন। আলজাজিরা, এএফপি ও আনাদোলুর খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান তীব্র উত্তেজনার মধ্যেই ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নির্মাণাধীন একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার অভিযোগ উঠেছে। রবিবার ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থা (এইওআই) দাবি করেছে, মার্কিন বাহিনী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে দারখোভিন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।
ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক বিবৃতিতে এইওআই জানায়, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে যুক্তরাষ্ট্র রবিবার নির্মাণাধীন দারখোভিন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। সংস্থাটি এ হামলাকে ‘বর্বর’ ও ‘আগ্রাসি’ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছে। পরমাণু শক্তি সংস্থার ভাষ্য, খুজেস্তান প্রদেশে অবস্থিত বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে হামলার ফলে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বিস্তারিত মূল্যায়ন চলছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, স্থানীয় সময় রবিবার ভোর ৩টা ৩৯ মিনিটে এ হামলা চালানো হয়।
এদিকে এক বিবৃতিতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশনায় ইরানের স্থানীয় সময় রবিবার রাত ১টা ৩০ মিনিট থেকে বিমান হামলা শুরু হয়। বিবৃতিতে সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বলেছে, ‘হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের প্রতি ইরানের হুমকির সক্ষমতা আরও হ্রাস করতে, আর গত রাতে জর্ডানে আমেরিকান সেনাদের বিরুদ্ধে হামলা চালানো ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরকে দ্রুত শাস্তি দিতে এ আক্রমণগুলোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।’ তারা আরও জানায়, ‘সর্বশেষ অভিযানে ইরানের সামরিক বাহিনীর উপকূলীয় নজরদারি ও প্রতিরক্ষা স্থাপনাগুলোতে, সামুদ্রিক সক্ষমতাগুলোতে এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণাগারগুলোতে সফলভাবে আঘাত হানা হয়েছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের বাহিনীগুলোকে লক্ষ্যস্থল করা হয়েছে।’ পরে আরেক বিবৃতিতে সেন্টকম জানায়, কমান্ডার-ইন-চিফের নির্দেশনায় ইরানের বিরুদ্ধে টানা অষ্টম রাতের সামরিক অভিযান শেষ হয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের বার্তা সংস্থা মেহের জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর সিরিকের কাছে একটি হামলা হয়েছে, কিন্তু তাতে কোনো হতাহত বা অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির খবর হয়নি। মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো ইরানের কেশম দ্বীপে এক দফা হামলা চালিয়েছে। দ্বীপটিতে অন্তত ছয়টি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। কোথায় আঘাত হানা হয়েছে তা খুঁজে দেখতে ও সেখানে কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে জরুরি, নিরাপত্তা ও উদ্ধার অভিযান চালাতে সক্ষম দলগুলোকে মোতায়েন করা হয়েছে। খবরে বলা হয়, বন্দর আব্বাস শহরেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। হরমোজগান শহরের হাজিয়াবাদ ও সিরিকের মতো আরও কয়েকটি শহরে হামলা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
তাসনিম আরও জানিয়েছে, মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো ইরানের দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ খুজেস্তানের শাদেগান শহরের নিকটবর্তী একটি এলাকায়ও হামলা চালিয়েছে।
ইরানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, মার্কিন হামলার জবাবে তারা পশ্চিম এশিয়াজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন সামরিক অবস্থানগুলোতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল-জাজিরা জানিয়েছে, ইরানের হামলায় কুয়েতে একটি বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র ও সমুদ্রের পানি শোধনাগারের একটি অংশে আগুন লেগেছে। আগুন নেভাতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের কয়েকজন কর্মী ও এক বেসামরিক শ্রমিক আহত হয়েছেন।
বিশ্বজুড়ে মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তা সতর্কতা : ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা আরও তীব্র হওয়ায় বিশ্বব্যাপী অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের জন্য নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানকারীদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সতর্কবার্তায় বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার কারণে নিরাপত্তা পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে এবং যেকোনো সময় পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটতে পারে। সতর্কবার্তায় বিশ্বজুড়ে থাকা মার্কিন নাগরিকদের স্থানীয় পরিস্থিতির সর্বশেষ তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত নাগরিকদের নিকটস্থ মার্কিন দূতাবাস বা কনস্যুলেট থেকে দেওয়া নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।
পররাষ্ট্র দপ্তর আরও জানায়, বিভিন্ন দেশে ফ্লাইট বাতিল এবং আকাশপথ বন্ধ থাকার কারণে আন্তর্জাতিক ভ্রমণে বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও বিভিন্ন দেশে মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনা ও নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালাতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।


