পানি উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে ২০২৪ সালে বরিশাল নগরীর মরে যাওয়া সাতটি খালের ১৮ কিলোমিটার খননকাজ শুরু করা হয়। কার্যাদেশ অনুযায়ী, পাঁচ কোটি ২৬ লাখ পাঁচটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান খাল পরিষ্কার করতেই জুলাই পর্যন্ত সময় পার করে দেয়। জুলাইয়ের শেষের দিকে ছাত্র-জনতার আন্দোলন জোরদার হলে কাজ না করে তিন কোটি ৯ লাখ ৪৩ হাজার টাকা বিল তুলে নেয় ওই পাঁচ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ফলে জীবন্ত সাতটি খাল এখন মৃত অবস্থায় পড়ে আছে। জানা গেছে, এসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বরিশালের বাইরের।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এসব ঠিকাদারের প্রকাশ্যে দেখা মিলছে না।
জানা গেছে, বরিশাল নগরীতে খাল রয়েছে ৪৬টি। এর মধ্যে ৩৯টি খালের কোনো অস্তিত্ব নেই। বাস্তবে খাল রয়েছে সাতটি।
সাতটি খাল খননের নামে অর্থ লোপাট করা হয়েছে। খাল খনন করা হয়নি। ফলে জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধানও হয়নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সফিক অ্যান্ড ব্রাদার্স সাগরদী খাল খননে এক কোটি ৫৮ লাখ টাকা, পলাশপুর খাল খনন বাবদ ইউনূস অ্যান্ড ব্রাদার্স ৬১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা এবং আমানতগঞ্জ খাল খনন বাবদ জামাল হোসেন এন্টারপ্রাইজ ৩৬ লাখ ৩৯ হাজার টাকা তুলে নিয়েছে। এ ছাড়া রূপাতলী খাল খনন বাবদ মেসার্স আল মামুন এন্টারপ্রাইজ তুলে নেয় ১৮ লাখ ৯৩ হাজার টাকা, একই প্রতিষ্ঠান চাঁদমারি খাল খননে ১৮ লাখ ৬৯ হাজার টাকা ও ভাটার খাল খননের নামে দুই লাখ ৯১ হাজার উত্তোলন করে।আর জেল খাল খনন বাবদ লুৎফর কবির নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ১২ লাখ ৮৩ হাজার টাকা তুলে নিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো বরিশালের বাইরের। এদের কাজ দেওয়ার সময় যথাযথ নিয়ম মানা হয়নি।
বরিশাল পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাবেদ ইকবাল বলেন, ‘২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন শুরু হয়। এরপর কাজ কী হয়েছে তা আমার জানা নেই। তবে এই কাজ বাবদ ওই জুলাই মাসেই দুই কোটি ৭০ লাখ টাকা বিল তুলে নেওয়া হয়। আমার কাছে এর একটি প্রমাণপত্র রয়েছে। তবে এই বিল যেসব ঠিকাদারের প্রতিষ্ঠানের নামে উত্তোলন করা হয়েছে তাদের বিস্তারিত কোনো তথ্য বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডে নেই।’
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, যে খালগুলো খনন করার কথা সেই খালগুলো প্রায় মৃত। পানিপ্রবাহ নেই এসব খালে। সব খালই কচুরিপানা ও আবর্জনায় ভরা। দখলে মৃত রয়েছে এর মধ্যে দুই-তিনটি খাল। পলাশপুর এলাকার বাসিন্দা রাজু খন্দকার জানান, খালটি খনন করা হয়েছে বলে তিনি এই প্রথম শুনেছেন। তিনি বলেন, খালটি খনন করা হলে পানিপ্রবাহ থাকত আর সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতায় পড়তে হতো না।
এদিকে বিভিন্ন সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের প্রকাশ্যে দেখা মিলছে না। সংশ্লিষ্ট ফোন নাম্বারে যোগাযোগ করেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। বরিশাল সিটি করপোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্থানীয় কর্মকর্তারাও তাঁদের খোঁজ পাচ্ছেন না।
নদী-খাল বাঁচাও আন্দোলন কমিটির সভাপতি কাজী এনায়েত হোসেন শিবলু বলেন, ‘বরিশাল নগরীতে ৪৬টি খাল রয়েছে। এই খালগুলোর কয়েকটি দখল করে ভরাট করা হয়েছে। বাকি খালগুলো বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সেগুলোর মধ্যে আছে নাপিতখালী, ভাটার খাল, নবগ্রাম, চাঁদমারী, ভেদুরিয়া, কলাডেমা, কাশিপুর, সোলনা, ভাড়ানী, পুডিয়ার, উত্তর নবগ্রাম সাগরদী, ঝোড়াখালী, তাজকাঠি, চৌপাশা, শোভারানী খাল, টিয়াখালী, রূপাতলী খাল ও পলাশপুর খাল। এগুলো একসময় বহমান ছিল। প্রথমে বরিশাল সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের উচিত এই খালাগুলো উদ্ধার করা, এরপর খননের ব্যবস্থা করা। আমার দেখা মতে, গত দুই যুগে বরিশালে খাল খনন হয়নি। খাল খননের নামে এই বিল কিভাবে উত্তোলন করা হলো তা আমার বোধগম্য নয়। অবশ্যই এ বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’


