উচ্চশিক্ষায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অন্যতম শীর্ষ গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসার নিয়ম ব্যাপক কঠিন করেছে। এতে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী হাজারো বাংলাদেশি শিক্ষার্থী। বিকল্প হিসেবে চীন, যুক্তরাজ্য, কানাডাসহ ইউরোপের অন্য দেশগুলোর দিকে ঝুঁকছেন তারা। ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন এবং পরবর্তী কর্মসংস্থানের সুযোগে বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে দেখছেন কূটনীতিকরা। অন্যদিকে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা খাতকে ঢেলে সাজানোর তাগিদ দিচ্ছেন শিক্ষাবিদরা।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে যেকোনো ডিগ্রি বা প্রোগ্রামের জন্য একজন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ চার বছর থাকার অনুমতি পাবেন। কোর্স শেষ হওয়ার পর দেশ ছাড়ার জন্য আগে যেখানে ৬০ দিন সময় পাওয়া যেত, সেটাও কমিয়ে ৩০ দিন করা হয়েছে। পিএইচডি বা থিসিস বিলম্বিত হওয়ায় চার বছরের বেশি সময় লাগলে সরাসরি মার্কিন অভিবাসন সংস্থার কাছে চড়া ফি দিয়ে মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন করতে হবে, যা অনুমোদনের ক্ষমতা আর বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে থাকবে না। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় পরিবর্তন ও ক্রেডিট ট্রান্সফারের সুযোগও সীমিত করা হয়েছে নতুন নিয়মে। আগামী সেপ্টেম্বর থেকে নতুন এই নিয়ম কার্যকর হবে।
ওপেন ডোরস রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজারের বেশি শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। নতুন এই কঠোর নিয়ম এসব শিক্ষার্থীদের ওপর বহুমুখী প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে ভিসার মেয়াদ চার বছর হওয়ায় মাস্টার্স ও পিএইডি শিক্ষার্থীরা বেশি চাপে পড়বেন। স্বাভাবিকভাবেই যুক্তরাষ্ট্রে এই কোর্স সম্পন্ন করতে ৫ থেকে ৭ বছর পর্যন্ত সময় লাগে। ফলে চার বছর পর ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর প্রক্রিয়া শিক্ষার্থীদের একাগ্রতা ও গবেষণার মানকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে। পাশাপাশি পড়াশোনা শেষে কর্মসংস্থানের সুযোগ একেবারেই সংকুচিত হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীরা নিজ বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত ক্ষেত্রে কাজের জন্য ‘অপশনাল প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং’ এর সুবিধা পেলেও নতুন নিয়মে এর অনুমোদন আরও জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় পরিবর্তন কিংবা ক্রেডিট ট্রান্সফারের সুযোগ সীমিত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা খর্ব করছে।
শিক্ষার্থীদের মানসিক ট্রমা ও অনিশ্চয়তা
যুক্তরাষ্ট্রে পিএইডি অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী তাজরীন ইসলাম তন্বী জানান, ভিসার এই নতুন নিয়ম তাদের চরম মানসিক ট্রমায় ফেলেছে। ল্যাবভিত্তিক গবেষণা, থিসিস পেপার সাবমিশন বা ফিল্ডওয়ার্কের কারণে পড়াশোনা শেষ করতেই চার বছরের বেশি সময় লেগে যায়। আগে ‘ডিউরেশন অব স্ট্যাটাস’ থাকার কারণে ভিসা নিয়ে বাড়তি কোনো চিন্তা করতে হতো না, পুরো মনোযোগটা গবেষণায় দেওয়া যেত। কিন্তু এখন চার বছর পর ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট অফিস আর কোনো সাহায্য করতে পারবে না। সরাসরি অভিবাসন সংস্থার কাছে আবেদন করতে হবে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ভরা। সবচেয়ে বড় ভয়ের জায়গা হলো, যদি কোনো কারণে ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন বাতিল হয়ে যায়, তবে মাঝপথে পড়াশোনা ও এত দিনের কষ্ট সব ভেস্তে যাবে। এই অনিশ্চয়তা মাথার ওপর ঝুলতে থাকলে কোনো শিক্ষার্থীর পক্ষেই গবেষণায় শতভাগ মনোযোগ দেওয়া সম্ভব না।
বিকল্প বাজার ও কূটনৈতিক পর্যবেক্ষণ
উচ্চশিক্ষা নিয়ে কাজ করা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন নিয়মের ফলে শিক্ষার্থীরা এখন যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ ইউরোপের দেশগুলোকে বিকল্প হিসেবে ভাবছেন, যেখানে পড়াশোনা শেষে কাজের সুযোগ বা পিআর (স্থায়ী আবাসন) পাওয়ার প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সহজ। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এন্ট্রিএব্রড এর স্বত্বাধিকারী মোজাম্মেল হোসেন বলেন, ভিসা জটিলতা ও নতুন নিয়মে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা নিয়ে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আর শিক্ষার্থীরাও এসব ঝুঁকি দেখে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ফলে তারা ইউরোপের বাজারের দিকে গুরুত্ব বাড়াচ্ছেন।
এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, এটা ভালো কোনো খবর না। ভিসা নিয়ম কঠিন হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থীই যুক্তরাষ্ট্রে যেতে আগ্রহী হবে না। কারণ সবাই লেখাপড়া শেষ করে আরেকটু সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্যই বিদেশে যায়। সেই সুযোগ না থাকলে অবশ্যই হতাশা কাজ করবে। এই ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের আরও বেশি সচেতন হতে হবে এবং নতুন বাস্তবতার আলোকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের তাগিদ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের ফলে শিক্ষার্থীরা অন্য দেশের দিকে ঝুঁকে যাবে, যা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য অনেকেই চীনে যাওয়া শুরু করছেন। তবে এটা কোনো সমাধান নয়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও ভালো করে ঢেলে সাজাতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের এই কঠিন সিদ্ধান্ত আমাদের জন্য ছদ্মবেশে আশীর্বাদ হতে পারে, যদি নীতিনির্ধারকরা শিক্ষা ব্যবস্থাটাকে আরও ভালো কীভাবে করা যায় তার ওপরে নজর দেন।
বাংলাদেশে শিক্ষা বাজেট দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম উল্লেখ করে সাবেক এই অধ্যাপক আরও বলেন, শিক্ষায় বরাদ্দের দিক থেকে এই অঞ্চলে আমরা সবার পেছনে, যেখানে নেপাল ও মালদ্বীপ অনেক এগিয়ে আছে। আর যা বরাদ্দ দেওয়া হয় তার বেশির ভাগই শিক্ষকের বেতনের পেছনে খরচ হয়। সেখানে গবেষণা থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়নের জন্য কিছুই থাকে না। এজন্য বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি গবেষণার মান বৃদ্ধিতে সরকারের গুরুত্ব দেওয়া উচিত।


