Homeপ্রবাসের খবরকুয়েতে গৃহহীন হয়ে রাস্তায় বহু প্রবাসী বাংলাদেশী

হঠাৎ উচ্ছেদ অভিযান ও ঘর ভাড়া বৃদ্ধি:
কুয়েতে গৃহহীন হয়ে রাস্তায় বহু প্রবাসী বাংলাদেশী

ঝুঁকিপূর্ণ ভবন উচ্ছেদ ও অবৈধ অভিবাসীবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানের কারণে কুয়েতপ্রবাসী বাংলাদেশীরা এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন। বাসস্থান হারিয়ে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী শ্রমিকের দিন-রাত কাটছে খোলা আকাশের নিচে কিংবা ভবনের ছাদে। গত ১৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এ সংকট বর্তমানে তীব্র আকার ধারণ করেছে। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে দেশটির তাপমাত্রা প্রায় ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ঠেকেছে। তীব্র গরমে অনেক প্রবাসী অসুস্থ হয়ে পড়লেও বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে কোনো ধরনের কার্যকর সহযোগিতা মিলছে না বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন।

কুয়েতের সরকারি পরিসংখ্যানের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায় সাড়ে তিন লাখ বাংলাদেশী শ্রমিক বসবাস করছেন, যাদের একটি বড় অংশ এখন চরম আবাসন সংকটে। ১৫ জুলাই রাতে কুয়েতের প্রথম উপপ্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ ফাহাদ ইউসুফ সৌদ আল-সাবাহর সরাসরি তত্ত্বাবধানে জিলিব আল-শুয়ুখ, হাসাবিয়া ও আব্বাসিয়া এলাকায় এই যৌথ অভিযান শুরু হয়। সেনাবাহিনী, ন্যাশনাল গার্ড ও ফায়ার ফোর্সের সহায়তায় পরিচালিত এই অভিযানে আইন লঙ্ঘনকারী ভবনগুলোর বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১১ মাসেই (জুলাই-মে) কুয়েত প্রবাসীরা ১৬১ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন। রেমিট্যান্স আহরণের ক্ষেত্রে কুয়েতের অবস্থান অষ্টম। অথচ এই সংকটের সময়ে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি প্রবাসীদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই।

টানা তিনদিন খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করা কুয়েতপ্রবাসী আবদুল কাইয়ুম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বুধবার রাত ১২টার দিকে হঠাৎ বিদ্যুৎ-পানি কেটে বাসা থেকে বের করে দেয়া হয়। ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস গরমে গায়ের চামড়া পুড়ে যাচ্ছে। টানা তিনদিন ঘুম, গোসল ও পানি ছাড়া আছি। দূতাবাসের পক্ষ থেকে কোনো সহযোগিতা আমরা পাইনি।”

রাতভর উচ্ছেদ ও ঘর ভাড়া দ্বিগুণ

উচ্ছেদের শিকার প্রবাসীরা জানান, হাসাবিয়া ও আব্বাসিয়া এলাকায় ১০ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশী থাকেন। আব্বাসিয়ার বাসিন্দা রিয়াজুল ইসলাম জানান, রাত ৩টার দিকে পুলিশ এসে মাত্র ৫ মিনিটের মধ্যে পাসপোর্ট, মোবাইল ও আকামা নিয়ে ঘর ছাড়ার নির্দেশ দেয়। পরে অনেকে বাধ্য হয়ে ভবনের ছাদে আশ্রয় নিলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে সবাইকে বের করে দেয়।

এই সুযোগে স্থানীয় বাড়িওয়ালারা রাতারাতি ঘর ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন। আগে যেখানে ২০০ থেকে ২৫০ দিনার (প্রায় ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা) এর মধ্যে বাসা ভাড়া পাওয়া যেত, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০০ থেকে ৫০০ দিনার (দেড় থেকে ২ লাখ টাকা), যা সাধারণ প্রবাসীদের আয়ের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

দূতাবাসের ভূমিকা ও সরকারি ভাষ্য

১৬ জুলাই বাংলাদেশ দূতাবাস এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, বাস্তুচ্যুত প্রবাসীদের জন্য কুয়েত সরকার একটি সরকারি স্কুলে অস্থায়ী শেল্টার হাউজের ব্যবস্থা করেছে। দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ও শ্রম কাউন্সেলর শোয়াইব-উল-ইসলাম তরফদার ওই শেল্টার হাউজ পরিদর্শন করেছেন। তবে প্রবাসীরা বলছেন, ওই শেল্টারে অবস্থানকালে কর্মস্থলে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই, সেখান থেকে বের হতে হলে অন্য আবাসন ব্যবস্থার মুচলেকা দিতে হবে। ফলে জীবিকা হারানোর ভয়ে অনেকেই সেখানে যাচ্ছেন না।

দূতাবাস সূত্র জানায়, উচ্ছেদের নোটিস অনেক আগেই বাড়ির মালিকদের দেয়া হয়েছিল, কিন্তু ভাড়া হারানোর ভয়ে তারা প্রবাসীদের কিছু জানায়নি। হঠাৎ করে এত বিপুল পরিমাণ প্রবাসীর জন্য আলাদা ভবন ভাড়া নেয়ার মতো পরিস্থিতিও দূতাবাসের নেই।

এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর জানান, তিনি কুয়েতের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত অবগত নন। তবে তিনি বলেন, “দূতাবাসের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহায়তা করা হবে। এটি যেহেতু কুয়েত সরকারের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, তাই বিস্তারিত খোঁজখবর নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে আমাদের পক্ষ থেকে যা করণীয়, সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়া হবে।”

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য