সংসদের সদ্য সমাপ্ত বাজেট অধিবেশনে মূলত চারটি বড় ইস্যুতে সরকারি ও বিরোধীদলীয় জোটের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। সংবিধান সংশোধন, জুলাই সনদ, মুক্তিযুদ্ধ এবং মদ নিষিদ্ধের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে দুই পক্ষের বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে সংসদ ফ্লোর বারবার উত্তপ্ত হয়েছে, এমনকি ওয়াকআউটের মতো ঘটনাও ঘটেছে। এই বিরোধের জেরে বিরোধীদলীয় জোট ইতিমধ্যে রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়েছে, অন্যদিকে সরকারদলীয় জোট আলোচনার পথ খোলা রাখার কথা জানিয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশন গত ১৫ জুলাই শেষ হয়েছে। ৭ জুন শুরু হওয়া ২৬ কার্যদিবসের এই অধিবেশনে ১০টি সরকারি বিল পাস এবং সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিসহ মোট ১৮টি সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়। তবে বেশ কয়েকটি নীতিগত বিষয়ে দুই জোটের অনড় অবস্থান সংসদীয় কার্যক্রমে নতুন জটিলতা তৈরি করেছে।
সংবিধান সংশোধন ও কমিটির নাম নিয়ে জটিলতা
বাজেট অধিবেশনে সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে ১৭ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে সরকারদলীয় জোট। তবে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর পাঁচজন এমপির নাম বাকি রেখেই ১২ সদস্যের এই কমিটি ঘোষণা করা হয়। বিরোধী দল এই কমিটিকে প্রত্যাখ্যান করে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে। অধিবেশনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পর্দার আড়ালে নানা দেনদরবার হলেও বিরোধীদলীয় জোট তাদের অবস্থানে অনড় থাকে এবং কোনো নাম জমা দেয়নি। ফলে বিরোধী দলের অন্তর্ভুক্তি ছাড়া সংবিধান সংশোধনের এই বিশেষ কমিটির ভবিষ্যৎ ও পুরো প্রক্রিয়াটিই এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
জুলাই সনদ ও কৃতিত্বের লড়াই
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন এবং এর কৃতিত্ব নিয়ে দুই জোটের শীর্ষ নেতারা সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকেই একে অপরের দিকে কাদা ছোঁড়াছুড়ি করছেন। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে বিরোধী জোট প্রশ্ন তুললে, পাল্টা জবাবে সরকারদলীয় জোটের এমপিরা বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের ‘দুই শপথ’ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এ নিয়ে দুই পক্ষের বাদানুবাদ ও পাল্টাপাল্টি যুক্তি বাজেট অধিবেশনজুড়েই অব্যাহত ছিল।
মুক্তিযুদ্ধ ও ক্ষমা প্রার্থনার দাবি
সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে একাধিক এমপি মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, যা দুই জোটের দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। গত ২৮ জুন বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “একাত্তর সালের ভূমিকার জন্য আপনারা একবারও ক্ষমা প্রার্থনা করলেন না। জাতির সামনে আপনাদের ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত ছিল। এখনো সময় আছে এবং আপনাদের বিষয়টি ভেবে দেখা উচিত।” এর জবাবে বিরোধী দলের নেতা ডা. শফিকুর রহমান সরাসরি ক্ষমার প্রসঙ্গে কথা না বলে অতীত রাজনীতির ‘খোঁচা মারার’ সংস্কৃতি পরিহার করার আহ্বান জানান। তিনি বিরোধী দলকে হেনস্তা করার প্রবণতা বন্ধ করে একটি ইতিবাচক, গঠনমূলক ও দুর্নীতিমুক্ত নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার তাগিদ দেন।
বিল পাস ও সংসদীয় পরিসংখ্যান
মুক্তিযুদ্ধ ও সংবিধানের পাশাপাশি মদ ও জুয়া আইনসহ আরও অন্তত আধা ডজন বিল নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য তৈরি হয়। তবে সরকারি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে শেষ পর্যন্ত বিলগুলো সংসদে পাস হয়ে যায়।
সংসদ সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবারের অধিবেশনে বাজেটের ওপর মোট ১৪ কার্যদিবস ধরে ৪৮ ঘণ্টা ৫১ মিনিট সাধারণ আলোচনা চলে, যেখানে ৩১৬ জন সংসদ সদস্য অংশ নেন। এর মধ্যে সরকারি দলের ২০০ জন এবং বিরোধী দলের ৯১ জন সদস্য বক্তব্য রাখেন। দুই জোটের নেতারাই মনে করেন, গণতন্ত্রের স্বার্থে সুস্থ বিতর্ক স্বাভাবিক, তবে এই মতবিরোধ যেন সংসদকে অকার্যকর করে না তোলে, সেটিই এখন বড় প্রত্যাশা।


