Homeআন্তর্জাতিকযুক্তরাজ্যের অর্থমন্ত্রী হচ্ছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ

যুক্তরাজ্যের অর্থমন্ত্রী হচ্ছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ

যুক্তরাজ্যের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম তার মন্ত্রিসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদকে অর্থমন্ত্রী (চ্যান্সেলর অব দ্য এক্সচেকার) হিসেবে নিয়োগ দিতে যাচ্ছেন। বার্নহামের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত একাধিক সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। এই নিয়োগ বাস্তবায়িত হলে লেবার সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে বড় ধরনের রদবদল হবে।

বার্নহামের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত তিন ব্যক্তি ব্রিটিশ দৈনিক ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে জানালেন, আগামী সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরই শাবানা মাহমুদের হাতে ট্রেজারির দায়িত্ব তুলে দেওয়া হবে।

তবে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি বার্নহামের মুখপাত্র। তিনি বলেছেন, মন্ত্রিসভার পদ নিয়ে এখন যে আলোচনা চলছে, তা ‘জল্পনা-কল্পনা’। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর সোমবারই মন্ত্রিসভার সদস্যদের নাম ঘোষণা করা হবে। তবে বার্নহামের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তি বলেন, ‘শাবানার বিষয়টি চূড়ান্ত। তিনি অবশ্যই চ্যান্সেলর হচ্ছেন।’

আরেকটি সূত্র জানায়, শাবানা মাহমুদ ট্রেজারির দায়িত্ব পাচ্ছেন এবং আগে যাকে অর্থমন্ত্রীর দৌড়ে এগিয়ে মনে করা হচ্ছিল জ্বালানিমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড— তাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা হতে পারে। বার্নহামের ঘনিষ্ঠ এক সহযোগী শাবানা মাহমুদের সম্ভাব্য নিয়োগ নিয়ে বললেন, ‘এটা থেকে আপনাকে নিরুৎসাহিত করব না।’ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এসব তথ্য নিয়ে শাবানা মাহমুদের দপ্তরও কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। বার্নহামের টিমও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

শাবানা মাহমুদ অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পেতে পারেন, এমন জল্পনা আর্থিক বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। গতকাল বুধবার ইউরোর বিপরীতে ব্রিটিশ পাউন্ড স্টার্লিং এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছায়। বাজারের ধারণা, বিদায়ী অর্থমন্ত্রী র‍্যাচেল রিভসের স্থলাভিষিক্ত হবেন মাহমুদ, এড মিলিব্যান্ড নন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার আগামী সোমবার পদ ছাড়বেন।

অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে শাবানা মাহমুদের সরাসরি অভিজ্ঞতা সীমিত। তবে লেবার পার্টির মধ্য-ডানপন্থী হিসেবে তিনি পরিচিত। কঠোর ও দক্ষ প্রশাসক হিসেবে তার সুনাম রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তিনি বিতর্কিত অভিবাসন সংস্কার কার্যক্রম তদারক করেছেন। এর আগে তিনি বিচারমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন।

শাবানা মাহমুদের সহকর্মীরা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় বার্নহামের সঙ্গে তার একাধিক নীতিগত আলোচনা হয়েছে। সেগুলোর বেশিরভাগ ছিল স্বরাষ্ট্রবিষয়ক, তবে অর্থনীতি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে তারা দাবি করেন, তাকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়ার কথা জানানো হয়নি। ভবিষ্যৎ মন্ত্রিসভা নিয়ে এখনো অনেক ‘জল্পনা’ রয়েছে।

নতুন অর্থমন্ত্রীর সামনে প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ হবে শরৎকালীন বাজেট প্রণয়ন। এমন এক সময়ে তাকে এই দায়িত্ব নিতে হবে, যখন সরকারি অর্থনীতি নিয়ে চাপ বাড়ছে।

সাবেক ইংল্যান্ড ফুটবলার গ্যারি লিনেকারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বার্নহাম বলেন, দেশের অর্থনীতি সামাল দিতে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া লাগতে পারে। সম্পদের ওপর নতুন কর আরোপের সম্ভাবনাও তিনি নাকচ করেননি।

বার্নহাম বলেন, ‘আমি এমন কেউ নই, যেকোনো বিদ্বেষ বা পূর্বধারণা নিয়ে এসে শুরুতেই একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে দোষারোপ করব।’

তিনি আরও বললেন, ‘আমি কঠিন সিদ্ধান্ত এড়িয়ে যাব না। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, আমরা নিজেদের ব্যয় নিজেরাই বহন করতে পারি। আর কোনো একসময় হয়তো মানুষের কাছ থেকে আরও কিছুটা বেশি নিতে হতে পারে।’

সম্পদ কর (ওয়েলথ ট্যাক্স) আরোপের সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেছেন, ‘এ মুহূর্তে আমি কোনো কিছুই উড়িয়ে দিচ্ছি না। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের সমাজে আরও বেশি ন্যায্যতা থাকা দরকার।’

একই সাক্ষাৎকারে বার্নহাম বলেন, বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনি দেশের আর্থিক অবস্থা ভালোভাবে মূল্যায়ন করবেন।

তিনি বললেন, ‘আমাদের কঠোর পরিশ্রম করতে হবে, যাতে আমরা নিজেদের ব্যয় নিজেরাই বহন করতে পারি। আর কোনো একসময় হয়তো আরও কিছু অর্থ সংগ্রহ করতে হতে পারে। তবে সেই সিদ্ধান্ত এখন নয়, পরে নেওয়া হবে।’

এড মিলিব্যান্ডকে এত দিন অর্থমন্ত্রীর প্রধান দাবিদার হিসেবে দেখা হচ্ছিল। লেবার পার্টির মধ্য-বামপন্থী এই নেতা দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নেট-জিরো নীতির অন্যতম প্রবক্তা। তিনি একসময় ট্রেজারির উপদেষ্টাও ছিলেন। অর্থনীতি বিষয়ে তার দক্ষতা ট্রেজারির অনেক সাবেক কর্মকর্তার কাছেই সমাদৃত।

তবে লেবার পার্টির অনেক সংসদ সদস্য ও কয়েকটি ট্রেড ইউনিয়নের অভিযোগ, মিলিব্যান্ডের নেট-জিরো নীতির ওপর অতিরিক্ত জোর অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হয়েছে। অন্যদিকে করপোরেট খাত ও লন্ডনের আর্থিক মহলের আশঙ্কা, তিনি অর্থমন্ত্রী হলে ঋণনির্ভর ব্যয় বাড়াতে পারেন বা ব্যবসাবান্ধব নয়— এমন নীতি অনুসরণ করতে পারেন।

এড মিলিব্যান্ডের বড় ভাই ডেভিড মিলিব্যান্ডকেও একসময় বার্নহামের সম্ভাব্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল বলে লেবার পার্টির কয়েকজন সাংসদ জানিয়েছেন।

আগামী শুক্রবার লেবার পার্টির নেতা হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচিত হবেন অ্যান্ডি বার্নহাম। এরপর সোমবার তিনি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেবেন এবং সেদিনই নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের নাম ঘোষণা করবেন।

বার্নহামের ঘনিষ্ঠদের ভাষ্য, সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেইনার, লেবারের ডেপুটি নেতা লুসি পাওয়েল, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং এবং সাবেক পরিবহনমন্ত্রী লুইস হেইকে নতুন মন্ত্রিসভায় দেখা যেতে পারে।

বর্তমান প্রধান হুইপ জনাথন রেনল্ডস আবারও ব্যবসাবিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব পেতে পারেন। এ ছাড়া বার্নহামের অন্যতম অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মিয়াতা ফাহনবুল্লাহ এবং তার আরেক ঘনিষ্ঠ সহযোগী অ্যানেলিজ মিডগলিও মন্ত্রী হতে পারেন।

অন্যদিকে ব্যবসাবিষয়ক মন্ত্রী পিটার কাইল, প্রযুক্তিমন্ত্রী লিজ কেনডাল, আবাসনমন্ত্রী স্টিভ রিড এবং অ্যাটর্নি জেনারেল লর্ড রিচার্ড হারমারের মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বর্তমান অর্থমন্ত্রী র‍্যাচেল রিভস ও শিক্ষামন্ত্রী ব্রিজেট ফিলিপসন মন্ত্রিসভায় থাকবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। আর সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলিরও মন্ত্রিসভায় ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রসঙ্গত, ৪৫ বছর বয়সী শাবানা মাহমুদ লেবার পার্টির অন্যতম জ্যেষ্ঠ মুসলিম রাজনীতিক এবং ইংল্যান্ডের বার্মিংহাম লেডিউড আসনের সংসদ সদস্য। পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরের (আজাদ কাশ্মীর) বংশোদ্ভূত পরিবারে বার্মিংহামে তার জন্ম। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়ার পর তিনি সলিসিটর হিসেবে পেশাজীবন শুরু করেন। ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি ছায়া চিফ সেক্রেটারি টু দ্য ট্রেজারি, বিশ্ববিদ্যালয়বিষয়ক ছায়ামন্ত্রী, বিচারমন্ত্রী এবং সর্বশেষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। আইনশৃঙ্খলা, বিচার ও অভিবাসন নীতিতে দৃঢ় অবস্থানের জন্য তিনি পরিচিত। তবে অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে সীমিত।

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য