বর্ষার টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে গত ছয় দিনে দেশের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় দেশের অভ্যন্তরে ও উজানে বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পাওয়ায় নদ-নদীর পানি আবারও বাড়ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, এর ফলে দেশের ১০টি জেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটতে পারে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ফেনী, সিলেট, সুনামগঞ্জ, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, রংপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও শেরপুর জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতির শঙ্কা রয়েছে। এছাড়া তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও গাইবান্ধার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা হতে পারে। অন্যদিকে, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে সারা দেশে আরও অন্তত পাঁচ দিন ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা।
চট্টগ্রামে ৬ লাখ মানুষ পানিবন্দি, নগরীতে ফের জলাবদ্ধতা
বৃহত্তর চট্টগ্রামে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল কিছুটা কমে আসায় বন্যা পরিস্থিতির ধীরগতির উন্নতি হলেও চট্টগ্রাম জেলায় এখনও ছয় লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সাতকানিয়া উপজেলার ১১৭টি ওয়ার্ডে এখনও সাড়ে তিন লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি। বাঁশখালীতেও প্রায় ৬০ হাজার মানুষ জলকষ্টে ভুগছেন। দুর্গত এলাকাগুলোতে বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রামে বন্যা ও পাহাড়ধসে এ পর্যন্ত ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৫৯.৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। টানা বৃষ্টিতে গতকাল সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে চট্টগ্রাম নগরীর ইস্পাহানি সি গেট, আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা ও চান্দগাঁওসহ বিভিন্ন নিচু এলাকায় হাঁটু পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এতে অফিসগামী মানুষ ও সাধারণ বাসিন্দারা চরম দুর্ভোগে পড়েন। ভারি বৃষ্টির কারণে নগরীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা ও শ্রেণি কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।
ঢলে চকরিয়ায় দুজনের প্রাণহানি
কক্সবাজারের চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলায় বন্যা ও পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে আটজনে। গতকাল চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নে মায়ের সামনেই বানের স্রোতে তলিয়ে গিয়ে মোহাম্মদ আতাউল্লাহ (২০) নামের এক যুবক মারা যান। এছাড়া বানের পানিতে ভেসে নিখোঁজ থাকা সজিব জলদাস (১২) নামের এক শিশুর মরদেহ ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল উদ্ধার করেছে।
৫ দিন পর চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল শুরু
রেলপথ থেকে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর পাঁচ দিন পর আবারও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে সব ধরনের ট্রেন চলাচল শুরু হয়েছে। গতকাল রবিবার দুপুরে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা যাত্রীবাহী আন্তনগর ট্রেন ‘ট্যুরিস্ট এক্সপ্রেস’ চট্টগ্রাম স্টেশন থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়ে বিকেলে পর্যটন শহরে পৌঁছায়। চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টার আবু জাফর ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সিলেট ও সুনামগঞ্জে বাড়ছে পানি, আতঙ্কে সীমান্ত এলাকা
সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে। ভারতের মেঘালয় অঞ্চলে ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় পাহাড়ি ঢলের কারণে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানির উচ্চতা বাড়ছে। সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার ১৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ছাতক ও সুনামগঞ্জ পয়েন্টে সুরমা নদীর পানিও বিপৎসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. মিনহাজুর রহমান জানিয়েছেন, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিটি উপজেলায় কন্ট্রোল রুম খোলাসহ সব ধরনের প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। তবে হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে এবং আশ্রয়কেন্দ্র থেকে মানুষ বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে।


