গ্রাহকদের চুক্তি বাতিল করতে বারবার বাধা দেওয়ার দায়ে ভার্জিন মিডিয়াকে ২৮ মিলিয়ন পাউন্ড জরিমানা করেছে যুক্তরাজ্যের যোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফকম (Ofcom)। সংস্থাটি জানিয়েছে, তারা এমন কিছু সুনির্দিষ্ট কৌশল বা আচরণের প্রমাণ পেয়েছে যার মধ্যে রয়েছে কাস্টমার সার্ভিস প্রতিনিধিদের ইচ্ছাকৃতভাবে ফোন কেটে দেওয়া এবং কোনো কারণ ছাড়াই গ্রাহকদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষমান রাখা বা ‘হোল্ড’-এ রাখা। অফকম জানায়, তিন বছর সময়কালে গ্রাহকদের করা লাখ লাখ ফোন কল সম্ভবত সঠিকভাবে পরিচালনা করা হয়নি; এর ফলে সাধারণ গ্রাহকরা আরও ভালো ব্রলব্যান্ড, ল্যান্ডলাইন বা পে-টিভি সেবায় পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে সরাসরি বাধা বা বিলম্বের শিকার হয়েছেন।
ভার্জিন মিডিয়া তাদের এই ব্যর্থতা স্বীকার করায় এবং বিষয়টি নিষ্পত্তিতে সম্মত হওয়ায় জরিমানার পরিমাণ ৩০ শতাংশ কমানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি সেই অল্প সংখ্যক গ্রাহকের কাছে ক্ষমা চেয়েছে, যারা অতীতে নতুন কোনো চুক্তির বিষয়ে আলোচনা করতে বা পরিষেবা বাতিল করতে গিয়ে সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন। অফকমের তদন্তে যেসব আপত্তিকর আচরণের প্রমাণ পাওয়া গেছে তার মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয়ভাবে কল স্থানান্তর করা, ইচ্ছাকৃতভাবে কল কেটে দেওয়া, গ্রাহকদের পরিষেবা চালিয়ে যেতে বাধ্য করার জন্য বারবার চাপ প্রয়োগ এবং অকারণে দীর্ঘ সময় অপেক্ষারত রাখা। সংস্থাটি আরও জানায়, ভার্জিন মিডিয়ার কমিশন ব্যবস্থা কল সেন্টারের কর্মীদের এই ধরনের আচরণ করতে কার্যত উৎসাহিত করত এবং এর জন্য তাদের আর্থিকভাবে পুরস্কৃতও করা হতো।
ভার্জিন মিডিয়া জানিয়েছে, তারা এই সময়ের মধ্যে গ্রাহকদের করা সমস্ত আনুষ্ঠানিক অভিযোগের সমাধান করেছে এবং যেখানে উপযুক্ত সেখানে ক্ষতিপূরণ বা প্রতিকারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে অফকম জানিয়েছে, যেসব ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহক অভিযোগ করেছিলেন, তাদের প্রত্যেকেই প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন কি না তা আগামী ছয় মাসের মধ্যে ভার্জিন মিডিয়াকে নিশ্চিত করতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি আরও বলে যে তাদের নিয়মাবলী অত্যন্ত স্পষ্ট; টেলিকম সেবাদাতাদের কোনো শর্ত বা প্রক্রিয়া এমন হওয়া উচিত নয় যা চুক্তি বাতিল করতে ইচ্ছুক গ্রাহকদের নিরুৎসাহিত করে। অথচ ভার্জিনের এই ব্যর্থতাগুলো লাখ লাখ কলের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের নিরুৎসাহিত করার কাজই করেছে।
তদন্তাধীন কলগুলো ১ জানুয়ারি ২০২২ থেকে ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৪-এর মধ্যবর্তী সময়ের। দেখা গেছে, কল সেন্টারের কর্মীরা মূলত গ্রাহকদের চুক্তি বাতিল ও অন্য সেবাদাতার কাছে চলে যাওয়া বিলম্বিত বা প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে এসব কল সঠিকভাবে পরিচালনা করেননি। অফকমের অবকাঠামো ও সংযোগ বিষয়ক গ্রুপ ডিরেক্টর নাটালি ব্ল্যাক বিবিসি-র ‘টুডে’ অনুষ্ঠানকে বলেছেন যে, ভার্জিন মিডিয়ার কর্মকাণ্ড ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং তা তাদের বাজে আচরণের বহিঃপ্রকাশ। তিনি বলেন, ২০২২ সালে যখন এই সমস্যার সূত্রপাত হয়, তখনই বিষয়টি অনানুষ্ঠানিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু তখন কোম্পানির পক্ষ থেকে তা করার মতো সদিচ্ছা দেখা যায়নি। এক বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, বিষয়টি স্পষ্ট; ভার্জিন মিডিয়া গ্রাহকদের জন্য তাদের চুক্তি বাতিল করার প্রক্রিয়াটি কঠিন করে তুলেছিল এবং পরবর্তীতে তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করেনি।
অফকম মোট ১,৮৮১ জন গ্রাহকের কাছ থেকে সরাসরি অভিযোগ পেয়েছিল, যারা চুক্তি বাতিলের ক্ষেত্রে মারাত্মক সমস্যার কথা জানিয়েছিলেন। এতে আরও বলা হয় যে, কিছু গ্রাহক বাধ্য হয়ে তাদের ‘ডাইরেক্ট ডেবিট’ বা স্বয়ংক্রিয় পেমেন্ট ব্যবস্থা বাতিল করার পথ বেছে নিয়েছিলেন; এর ফলে পেমেন্ট বকেয়া পড়ার মতো আরও জটিলতা সৃষ্টি হয়, যা সরাসরি তাদের ক্রেডিট স্কোরের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। নাটালি ব্ল্যাক জানান, অফকম ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধে আরও কড়া সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৪ সালে শুরু হওয়া ‘ওয়ান টাচ সুইচ’ প্রক্রিয়া, যার লক্ষ্য হলো ব্রডব্যান্ড বা ল্যান্ডলাইন পরিষেবা প্রদানকারী পরিবর্তন করাকে পুরোপুরি ঝামেলামুক্ত করা।
নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি দেখতে পায় যে, ভার্জিন মিডিয়া গ্রাহকদের ধরে রাখার জন্য নিয়োজিত কর্মীদের ক্ষেত্রে একটি দ্বি-স্তরের ব্যবস্থা চালু রেখেছিল এবং কেবল দ্বিতীয় স্তরের কর্মীরাই চুক্তি বাতিলের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারতেন। এর ফলে দশ লক্ষেরও বেশি গ্রাহককে অন্তত আরও একজন কর্মীর কাছে তাদের অনুরোধটি পুনরায় জানাতে হয়েছিল। তদন্তের পর ভার্জিন মিডিয়া তাদের কমিশন কাঠামো, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং গুণমান নিশ্চিতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়নসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে।
ভার্জিন মিডিয়ার একজন মুখপাত্র জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা তাদের গ্রাহক সেবা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে ঢেলে সাজিয়েছেন এবং বিভিন্ন বিনিয়োগের মাধ্যমে পুরানো বা দীর্ঘদিনের ঘাটতিগুলো দূর করেছেন। ব্যাপক বিনিয়োগের ওপর ভিত্তি করে তাদের এই আমূল পরিবর্তনের কৌশলটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। ওই মুখপাত্র আরও বলেন, অফকমের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ভার্জিন মিডিয়া এখন সবচেয়ে কম অভিযোগ পাওয়া ব্রডব্যান্ড পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং অভিযোগের সংখ্যা সর্বনিম্নে নেমে এসেছে। বিশেষ করে পরিষেবা ত্যাগ বা চুক্তি বাতিলের জটিলতা সংক্রান্ত অভিযোগ গত বছর ২০২৩ সালের তুলনায় ৮৯ শতাংশ কম ছিল। ভার্জিন মিডিয়াকে আগামী দুই মাসের মধ্যে এই জরিমানা পরিশোধ করতে হবে এবং এই অর্থ সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি জানিয়েছে, ভোক্তা সুরক্ষা বিধিমালার আওতায় তাদের আরোপ করা জরিমানার মধ্যে এটিই ছিল সর্বোচ্চ এবং সামগ্রিকভাবে তাদের ইতিহাসে এটি তৃতীয় বৃহত্তম জরিমানার ঘটনা।


