অনিয়মিত অভিবাসন মোকাবিলা এবং দেশের ভেতরে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে চিরুনি অভিযান শুরু করেছে পর্তুগালের ন্যাশনাল রিপাবলিকান গার্ড (এনআরজি)।
সংস্থাটির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০২৬ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত স্থল, সমুদ্র ও আকাশপথে পরিচালিত বিভিন্ন যৌথ ও বিশেষ অভিযানে ৩০০ জনেরও বেশি অনিয়মিত অভিবাসীকে শনাক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে আইনি প্রক্রিয়া মেনে প্রায় ১৫০ জনকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্বেচ্ছায় দেশ ত্যাগের নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশের অর্থনৈতিক ও কৃষি কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে বিশেষ চিরুনি অভিযান চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে পর্তুগালের বিভিন্ন অঞ্চলের স্ট্রবেরি খামার, প্রধান রেলওয়ে স্টেশন, আন্তঃদেশীয় সংযোগ সড়ক এবং সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকাগুলোতে নিয়মিত তদারকি ও তল্লাশি বহুগুণ জোরদার করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আটক ও শনাক্ত হওয়া অভিবাসীদের একটি বড় অংশ মূলত দক্ষিণ এশিয়া এবং পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নাগরিক। এর মধ্যে ভারত, নেপাল এবং গিনি বিসাউ থেকে আসা শ্রমিকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ইউরোপ ও উন্নত বিশ্বের শ্রমবাজারে প্রবেশের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলে এসে অনেকেই বৈধ নথিপত্রের মেয়াদ শেষ হওয়া সত্ত্বেও অবস্থান করছেন।
স্থানীয় কৃষি খামারের মালিকদের একাংশ জানান, মৌসুমি ফসলের সময় সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করতে হয় তাদের। তবে প্রশাসনের এই কঠোর অভিযানের ফলে কৃষি খাতে শ্রমিক সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো।
উন্নত জীবন, অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা এবং পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর এক বুক আশা নিয়ে হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে এসব অভিবাসী এদেশে আসেন। তবে পৌঁছানোর পর অনেকের ভাগ্যেই জুটছে চরম অনিশ্চয়তা ও প্রতিকূল পরিস্থিতি।
পর্তুগালের তদন্তকারী কর্মকর্তা ও মানবাধিকার কর্মীদের তথ্যানুযায়ী, অভিবাসীদের জীবনযাত্রার মান অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাদের যাপনচিত্রের প্রধান কয়েকটি সংকট।
ন্যূনতম মজুরি ও শোষণ: আইনি সুরক্ষার অভাবে অনেক অনিয়মিত শ্রমিককে নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরির চেয়েও কম মূল্যে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হচ্ছে।
বাসস্থান সংকট ও উচ্চ ভাড়া: সীমিত আয়ের বিপরীতে আবাসন খরচ আকাশচুম্বী হওয়ায়, এক একটি ছোট ঘরে গাদাগাদি করে অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াত: প্রত্যন্ত কর্মস্থলে পৌঁছাতে প্রতিদিন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে, যা তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করছে।
রেমিট্যান্সের চাপ: নিজ দেশে থাকা পরিবারের ভরণপোষণ এবং অভিবাসনের জন্য নেওয়া চড়া ঋণ শোধ করার তীব্র মানসিক চাপ রয়েছে তাদের ওপর।
স্থানীয় মানবাধিকার কর্মীরা জানান, অনেকেই আইনি বাধ্যবাধকতা এবং ভাষার দক্ষতার অভাবে স্থানীয় শ্রম আইনের সুবিধা নিতে পারেন না। ফলে তারা এক প্রকার বাধ্য হয়েই মালিকপক্ষের চাপিয়ে দেওয়া অস্বাস্থ্যকর ও অবৈধ কর্মপরিবেশ মেনে নিচ্ছেন
ন্যাশনাল রিপাবলিকান গার্ডের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, এই অভিযান কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে নয়, বরং মানবপাচার চক্র রুখতে এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে এই আইনি পদক্ষেপ। সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং অবৈধ কর্মসংস্থান প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আগামী দিনগুলোতে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে আটক অনিয়মিত অভিবাসীদের আইনি প্রক্রিয়া ও নথিপত্র যাচাইয়ের কাজ চলছে। যাদের স্বেচ্ছায় দেশত্যাগের নোটিশ দেওয়া হয়েছে, তারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দেশ না ছাড়লে তাদের জোরপূর্বক নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হতে পারে।


