Homeজাতীয়সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কোন পথে বাংলাদেশ?

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কোন পথে বাংলাদেশ?

ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, অধিকার ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে বাংলাদেশে। বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন ও সহিংসতার ঘটনা বেড়েছে কি না, তা নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও বিভিন্ন সংগঠনের পরিসংখ্যান ও দাবিদাওয়ায় উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ পূজা উদ্‌যাপন ফ্রন্ট ও বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ বলছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে দেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রাণহানি, মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট এবং নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, অভিযোগ পাওয়া মাত্রই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত দেশে ১৩৩টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ২৫ জন নিহত হয়েছেন এবং অন্তত ১৩টি উপাসনালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরা এ পরিস্থিতিতে নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন বলে সংগঠনটির দাবি।

পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, যেখানে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে বা খবর পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কোনো অভিযোগকে অবহেলা করা হচ্ছে না এবং আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ পূজা উদ্‌যাপন ফ্রন্ট সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সহিংসতা হিসেবে উল্লেখ করে আগামী ৯০ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্নের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটি সাত দফা দাবির মধ্যে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার, মব জাস্টিস বন্ধে আইন প্রণয়ন, মন্দির ও শ্মশানের নিরাপত্তা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ, সংখ্যালঘু সুরক্ষা কমিশন গঠন, ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় কারণে হেনস্তা বন্ধের দাবি জানিয়েছে।

ফ্রন্টের নেতারা বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত ‘রেইনবো নেশন’ ধারণাকে তারা ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখলেও কিছু উগ্রপন্থি গোষ্ঠী ও কুচক্রী মহল সরকারকে বিব্রত করতে হিন্দু সম্প্রদায়কে সফট টার্গেট হিসেবে ব্যবহার করছে।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিজন সরকার বলেন, কিছু ঘটনা যে ঘটছে তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে তারা সরকারের কাছ থেকে আরও কার্যকর ও সর্বাত্মক পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেন।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদও পৃথক আট দফা দাবি উত্থাপন করেছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন, হিন্দু ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টকে পূর্ণাঙ্গ ফাউন্ডেশনে রূপান্তর, দেবোত্তর সম্পত্তি রক্ষায় নতুন আইন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রার্থনার ব্যবস্থা, সংস্কৃত ও পালি শিক্ষার আধুনিকায়ন এবং দুর্গাপূজায় সরকারি ছুটি পাঁচ দিনে উন্নীত করা।

ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ বলেন, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতির উন্নতির প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে সেই পরিবর্তন দৃশ্যমান নয়। তার দাবি, এখনও প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৫০টি সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান বিচার দেখা যাচ্ছে না।

ঐক্য পরিষদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারিতে ৪৬টি, ফেব্রুয়ারিতে ৫০টি এবং মার্চে ৩৭টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এই সময়ে হত্যাকাণ্ড, মন্দিরে হামলা, ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের ঘটনাও রেকর্ড করা হয়েছে।

নারী নেত্রী খুশি কবীর বলেন, সমাজে সহনশীলতার অভাব বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার মতে, একটি ঘটনাও যেন বিচারহীন না থাকে, সেদিকে সরকারকে আরও মনোযোগী হতে হবে।

গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে এশিয়ার বৃহত্তম রামমূর্তি নির্মাণকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। ইমাম-উলামা পরিষদ নির্মাণকাজ বন্ধের দাবি জানালে গত ১১ জুন মন্দির কর্তৃপক্ষ নির্মাণকাজ সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করে।

মন্দির কমিটির নেতারা বলেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

অন্যদিকে, ইমাম-উলামা পরিষদের নেতারা দাবি করেন, এত বড় আকারের মূর্তি নির্মাণ ভবিষ্যতে সামাজিক অস্থিরতা ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার কারণ হতে পারে।

পলাশবাড়ী থানার ওসি সারওয়ার আলম খান জানান, বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে এবং উভয় পক্ষই শান্তিপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখার কথা জানিয়েছে।

রামমূর্তি নির্মাণ স্থগিতের প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন স্থানে সনাতনী সংগঠনগুলো বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে। রাজধানীর শাহবাগেও মশাল মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।

বাগেরহাটের শরণখোলায় গত ৬ মে এক হিন্দু পরিবারের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় পাঁচ নারী আহত হন।

গৃহকর্তা রবীন্দ্রনাথ ঢালী অভিযোগ করেন, জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষ তার বাড়িতে হামলা চালিয়ে নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র লুট করে নিয়ে গেছে।

শরণখোলা থানার ওসি শামিনুল হক বলেন, এ ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং ইতোমধ্যে দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

শরীয়তপুরের ডামুড্যা পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুজিৎ কর্মকারকে গত ৭ জুন বিদ্যালয়ের ফটকের সামনে মারধরের ঘটনা আলোচনায় আসে।

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হলেও এখনও কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

সিলেট শহরে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলে এক ব্যবসায়ীকে গণপিটুনির ঘটনা ঘটে। পরে তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।

ব্যবসায়ী খগেন্দ্র চন্দ্র দাসের ছেলে মামলা দায়ের করলে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে পরে বাদী আদালতে জানান, আসামিদের নাম ভুলবশত দেওয়া হয়েছিল। ফলে তারা জামিন পান। পুলিশ বলছে, তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং শিগগিরই চার্জশিট দেওয়া হবে।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিয়ে সংখ্যালঘু সংগঠন, মানবাধিকারকর্মী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলেও এগুলো জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। তাদের মতে, আইনের শাসন নিশ্চিত করা, অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার প্রধান শর্ত।

সূত্র: ডয়চে ভেলে।

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য