বোরো মৌসুমের নতুন ধান বাজারে আসার পর সাধারণত চালের দামে স্বস্তি ফেরার কথা। কিন্তু এবার দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। বাজারে চালের সরবরাহ বাড়লেও কমছে না দাম। বরং গত কয়েক সপ্তাহে মোটা, মাঝারি ও সরু—সব ধরনের চালের দামই বেড়েছে। ফলে ভোক্তাদের বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে, আর বাজারে নতুন করে অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের একাংশের অভিযোগ, ধানের উৎপাদন ভালো হলেও বড় মিলার, মজুদদার ও ব্যবসায়ীদের একাংশ কম দামে ধান কিনে মজুদ করছে। এর প্রভাব পড়ছে চালের বাজারে। ফলে ভরা মৌসুমেও দাম নিয়ন্ত্রণে আসছে না।
নওগাঁ, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, বগুড়া ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ দেশের প্রধান ধান-চালের মোকামগুলোতে গত দুই সপ্তাহে চালের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। পাইকারি বাজার ও মিলগেটে মোটা ও মাঝারি চালের কেজিতে দেড় থেকে ২ টাকা এবং সরু চালে প্রায় ৩ টাকা পর্যন্ত দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। খুচরা পর্যায়ে বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে ক্রেতাদের।
বর্তমানে নওগাঁর বাজারে কাটারি নাজির চাল প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৭২ টাকা এবং জিরা শাইল ৬৫ থেকে ৬৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মোটা চালের দামও ৫৫ টাকার নিচে নামছে না।
স্থানীয় মিলার গোলাম মোস্তফার দাবি, বড় পুঁজির ব্যবসায়ী ও মজুদদাররা বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা কম দামে ধান কিনে গুদামজাত করছে এবং পরে নিজেদের সুবিধামতো দামে চাল বিক্রি করছে। পর্যাপ্ত তদারকি না থাকায় বাজারে ভারসাম্য ফিরছে না।
তিনি বলেন, সরু ধানের বড় অংশ ইতোমধ্যে কিছু বড় মিলার ও ব্যবসায়ীর হাতে চলে গেছে। ফলে চালের বাজার কার্যত তাদের নিয়ন্ত্রণে। ক্ষুদ্র মিলাররা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন এবং নতুন ধান বাজারে এলেও তার সুফল ভোক্তারা পাচ্ছেন না।
তবে নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, দেশে ধান বা চালের কোনো সংকট নেই। সরকারি খাদ্য গুদামে সরবরাহ বাড়ায় মোটা ধানের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। ধানের দাম বাড়ার প্রভাবই চালের বাজারে পড়েছে।
ভোক্তা অধিকারকর্মী নাইস পারভীন বলছেন, ধানের হাট থেকে শুরু করে চালের পাইকারি ও খুচরা বাজার পর্যন্ত কার্যকর নজরদারির অভাব রয়েছে। ফলে অবৈধ মজুদ বাড়ছে এবং বাজারে কৃত্রিম চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত অভিযান ও কঠোর তদারকির দাবি জানান তিনি।
নওগাঁ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ফরহাদ খন্দকার বলেন, চলতি মৌসুমে ধানের উৎপাদন ভালো হয়েছে এবং সরবরাহও স্বাভাবিক রয়েছে। তাই কোনো অজুহাতে দাম বাড়ানোর সুযোগ নেই। বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং অবৈধ মজুদের বিরুদ্ধে শিগগিরই যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হবে।
কুষ্টিয়াতেও বাড়ছে চালের দাম
দেশের অন্যতম বড় চালের বাজার কুষ্টিয়াতেও ঈদের পর চালের দাম কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা বেড়েছে। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
কুষ্টিয়া পৌর বাজারের ব্যবসায়ী মাহমুদ মনজু জানান, বর্তমানে ২৫ কেজির ব্র্যান্ডেড মিনিকেট চালের বস্তা বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। নন-ব্র্যান্ড মিনিকেটের দাম ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৬৫০ টাকা। কাজললতা, আটাশ ও মোটা চালের দামও আগের তুলনায় বেড়েছে। বাসমতী চালের ২৫ কেজির বস্তা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ২০০ টাকায়।
মিল মালিক ও ব্যবসায়ীদের দাবি, ধানের দাম বৃদ্ধি এবং বিদ্যুতের খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। সামির এগ্রোর পরিচালক সামির খালেক বলেন, এলাকাভেদে মণপ্রতি ধানের দাম ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মিল পরিচালনার খরচও বেড়েছে।
কুষ্টিয়া জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদিন বলেন, কাঁচা ধান শুকানোর পর ওজন কমে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে প্রকৃত খরচ আরও বেড়ে যায়। ঈদের পরবর্তী সময়েও ধানের দাম তুলনামূলক বেশি থাকে।
চালের এই মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন সীমিত আয়ের মানুষ। কুষ্টিয়ার বেসরকারি চাকরিজীবী শরিফুল ইসলাম বলেন, আয় বাড়ছে না, কিন্তু চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম বাড়ছে। মাসিক আয়ের বড় অংশ এখন শুধু খাদ্য ব্যয়েই চলে যাচ্ছে। সংসারের অন্যান্য খরচ সামলানো ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উৎপাদন ভালো হওয়ার পরও যদি বাজারে মূল্যস্ফীতি অব্যাহত থাকে, তাহলে এর পেছনে সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা ও বাজার নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে উঠবে।


