পাবলিক পরীক্ষা, ভর্তি পরীক্ষা ও নিয়োগ পরীক্ষায় প্রযুক্তিনির্ভর জালিয়াতি ঠেকাতে নতুন আইন আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে প্রাথমিক খসড়ায় কঠোর শাস্তির যে প্রস্তাব ছিল, চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। ফলে ডিজিটাল জালিয়াতির জন্য প্রস্তাবিত ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ১ কোটি টাকা জরিমানার বিধান নেমে এসেছে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘দ্য পাবলিক এক্সামিনেশনস (অফেন্সেস) (সংশোধন) অ্যাক্ট, ২০২৬’-এর খসড়া চূড়ান্ত করেছে। অনুমোদনের জন্য এটি আজ জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিতব্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
নতুন আইনের আওতায় শুধু এসএসসি বা এইচএসসির মতো প্রচলিত পাবলিক পরীক্ষাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা, বিসিএসসহ বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষাও অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে উত্তরপত্রে কারসাজি, নম্বর পরিবর্তন এবং মোবাইল ফোন, স্মার্টওয়াচ, ব্লুটুথ বা অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে প্রতারণাকে ‘ডিজিটাল ম্যানিপুলেশন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গত ২ এপ্রিল মন্ত্রিসভা প্রস্তাবিত আইনের নীতিগত অনুমোদন দেয়। সে সময় সংঘবদ্ধ প্রশ্নফাঁস, পরীক্ষায় জালিয়াতি এবং গুজব ছড়ানোর মতো অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড বা ১ কোটি টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছিল। এছাড়া সংঘবদ্ধ অপরাধে জড়িতদের অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার প্রস্তাবও ছিল। তবে চূড়ান্ত খসড়ায় এসব শাস্তি অনেকটাই শিথিল করা হয়েছে।
বর্তমানে দেশে ১৯৮০ সালের পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন কার্যকর রয়েছে, যা মূলত এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে প্রণীত। ফলে নিয়োগ বা ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস ও জালিয়াতির ঘটনায় ওই আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ সীমিত।
তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে পরীক্ষা জালিয়াতির ধরনও বদলে গেছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে সংঘটিত অপরাধ মোকাবিলায় বিদ্যমান আইনকে অপ্রতুল মনে করেই সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৭ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পাবলিক পরীক্ষায় নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ২০০৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে পরীক্ষা-সংক্রান্ত ২০০টি মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৪৫টির। সাজা হয়েছে মাত্র একটি মামলায়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি বিদ্যমান আইনের সীমাবদ্ধতাকেই স্পষ্ট করে।
প্রস্তাবিত আইনের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, প্রায় ৪৫ বছর আগে প্রণীত আইনটি বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর বাস্তবতার সঙ্গে আর সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রশ্নফাঁস, জাল সনদ তৈরি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানো এবং ডিজিটাল কারসাজির মতো অপরাধ এখন শিক্ষা খাতের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
নতুন খসড়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘ডিজিটাল ম্যানিপুলেশন’কে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা। এর আওতায় ফলাফল, নম্বর, মেধাতালিকা কিংবা পরীক্ষা-সংক্রান্ত তথ্য হ্যাকিং, পরিবর্তন বা বিকৃত করার চেষ্টা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আইনটি পাস হলে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বা অন্যান্য অনলাইন মাধ্যমে প্রশ্নফাঁস, ভুয়া তথ্য ছড়ানো কিংবা ডিজিটাল উপায়ে পরীক্ষার ফল পরিবর্তনের মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নতুন আইনি ভিত্তি তৈরি হবে। তবে কঠোর শাস্তির প্রস্তাব কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়ে ইতোমধ্যে নানা মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।


