Homeঅর্থনীতিপাঁচ ব্যাংকের ধস, ব্যাংক খাতে রেকর্ড ১.৩৬ লাখ কোটি টাকার লোকসান

পাঁচ ব্যাংকের ধস, ব্যাংক খাতে রেকর্ড ১.৩৬ লাখ কোটি টাকার লোকসান

দেশের ব্যাংক খাতের আর্থিক স্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য। কিছু বহুজাতিক ও শক্তিশালী বেসরকারি ব্যাংক মুনাফা করলেও দুর্বল ও অনিয়মে জর্জরিত ব্যাংকগুলোর বিপুল ক্ষতির কারণে ২০২৫ সালে পুরো ব্যাংক খাত ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা লোকসানে পড়েছে। বিশেষ করে একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচ ব্যাংক এবং অনিয়মের অভিযোগে আলোচিত কয়েকটি ব্যাংকের বিপুল ক্ষতি পুরো খাতের আর্থিক চিত্রকে নেতিবাচক করে তুলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ও মাসিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কা

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ব্যাংক খাতের নিট মুনাফা ছিল ১৪ হাজার ২৩০ কোটি টাকা। ২০২৩ সালে তা বেড়ে ১৪ হাজার ৮৪০ কোটি টাকায় পৌঁছায়। ২০২৪ সালে মুনাফা কমে দাঁড়ায় ১২ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা। তবে ২০২৫ সালে এসে পুরো খাতই রেকর্ড পরিমাণ লোকসানে নিমজ্জিত হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যাংক সংস্কার কর্মসূচির আওতায় নয়টি ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মান আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিরীক্ষা করা হয়েছে। এতে দীর্ঘদিন আড়ালে থাকা আর্থিক দুর্বলতা প্রকাশ্যে এসেছে। এর আগে ২০০৪ সালে ব্যাংক খাত ৭৭৬ কোটি টাকা এবং ২০০৬ সালে ২ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা লোকসান করেছিল। আর ২০১২ সালে হলমার্ক কেলেঙ্কারির প্রভাবে সোনালী ব্যাংকের বড় ক্ষতির কারণে পুরো খাত ১ হাজার ৯৫ কোটি টাকা লোকসানে পড়েছিল।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ফার্স্ট সিকিউরিটি

ব্যাংকগুলোর প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ১০টি ব্যাংক মিলেই ১ লাখ ৫৭ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা ক্ষতির মুখে পড়ে। তবে ভালো পারফরম্যান্স করা দেশি ও বিদেশি ব্যাংকগুলোর মুনাফার কারণে সামগ্রিক লোকসান কিছুটা কমে আসে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে। ২০২৫ সালে ব্যাংকটির লোকসান দাঁড়িয়েছে ৬৬ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা। এরপর রয়েছে, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক: ৩১ হাজার কোটি টাকা, এক্সিম ব্যাংক: ২৮ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক: ১৩ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংক: ৪ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া জনতা ব্যাংক ৩ হাজার ৮২০ কোটি টাকা, এবি ব্যাংক ৩ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা, আইএফআইসি ব্যাংক ২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংক ২ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা এবং প্রিমিয়ার ব্যাংক ৯৯২ কোটি টাকা লোকসান করেছে।

মুনাফায় শীর্ষে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড

বিপরীত চিত্র দেখা গেছে কয়েকটি ব্যাংকে। বহুজাতিক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক তিন হাজার কোটি টাকার বেশি মুনাফা করে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। দেশীয় ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করেছে ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংক। ব্র্যাক ব্যাংক: ২ হাজার ২৫০ কোটি টাকা, সিটি ব্যাংক: ১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা, পূবালী ব্যাংক: ১ হাজার ৯০ কোটি টাকা।

ঋণের ৫৯ শতাংশ থেকে আয় নেই

ব্যাংক খাতের আরেক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে ঋণমান বিশ্লেষণে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার ঋণের মধ্যে ৫৯ টাকা এখন ঝুঁকিপূর্ণ বা ‘ডিস্ট্রেসড’ অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ এই বিপুল পরিমাণ ঋণ থেকে ব্যাংকগুলো কার্যত কোনো আয় করতে পারছে না। ২০২৫ সালের শেষে ডিস্ট্রেসড ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা পুনঃতফসিল করা ঋণ। বাকি অংশ খেলাপি ঋণ, অবলোপন করা ঋণ এবং আদালতের আদেশে স্থগিত থাকা ঋণ।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, আন্তর্জাতিকভাবে ডিস্ট্রেসড ঋণের নির্দিষ্ট সংজ্ঞা না থাকলেও সাধারণত যেসব ঋণ থেকে আয় আসে না বা নিয়মিত কিস্তি আদায় হয় না, সেগুলোকে এ শ্রেণিতে ফেলা হয়। তবে পুনঃতফসিল করা ঋণ থেকে কিস্তি আদায় চলমান থাকায় সেগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে ডিস্ট্রেসড ঋণ হিসেবে গণ্য করা হয় না। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল তদারকি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি ব্যাংক খাতকে এমন অবস্থায় নিয়ে এসেছে। ফলে শুধু ব্যাংক একীভূত করলেই সংকট কাটবে না; প্রয়োজন গভীর কাঠামোগত সংস্কার ও কঠোর জবাবদিহি।

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

সাম্প্রতিক মন্তব্য