Homeজাতীয়স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭৯% যায় নিজ পকেট থেকে

স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭৯% যায় নিজ পকেট থেকে

বর্তমানে দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশ মানুষকে নিজ পকেট থেকেই বহন করতে হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় বেশি। তাই স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও জনগণের চিকিৎসা ব্যয় কমানো, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বাজেটের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

গতকাল বুধবার সকালে রাজধানীর রূপায়ণ ট্রেড সেন্টারে ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের (এনডিএফ) আয়োজনে ‘স্বাস্থ্য বাজেট ২০২৬-২৭’ শীর্ষক স্বাস্থ্য সাংবাদিক কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন। এ আলোচনায় অংশ নেন স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য সাংবাদিকরা।

কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন এনডিএফের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. এ কে এম ওয়ালীউল্লাহ। প্রধান অতিথি ছিলেন যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ।lমূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক এবং প্রধান আলোচক ছিলেন স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ।

মূল প্রবন্ধে ড. রুমানা হক বলেন, স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ শুধু স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের জন্য নয়, দারিদ্র্য হ্রাস ও মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশ মানুষকে নিজ পকেট থেকে বহন করতে হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় বেশি। থাইল্যান্ডে এ হার ১০ শতাংশ এবং মালদ্বীপে ১৫ শতাংশ।তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা জিডিপির ১.০১ শতাংশ এবং জাতীয় বাজেটের ৭.৪ শতাংশ। গত এক দশকের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ বরাদ্দ। বাজেটে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, রোগ প্রতিরোধ, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য, পুষ্টি, টিকাদান এবং অসংক্রামক রোগের স্ক্রিনিংয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ড. রুমানা হক বলেন, স্টেন্ট, চোখের লেন্স, কিডনি ডায়ালিসিস যন্ত্রপাতি ও ক্যান্সারের ওষুধের কাঁচামালে করছাড় রোগীদের ব্যয় কমাতে সহায়ক হবে। পাশাপাশি পাঁচ হাজার চিকিৎসক ও এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, ই-হেলথ কার্ড চালু এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে।তবে উন্নয়ন বাজেটের প্রায় ২৩ হাজার ৫২২ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে, যার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রধান আলোচক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, দুর্নীতি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে বড় বাজেটের সুফল পাওয়া যাবে না। হাসপাতাল ব্যবস্থাপকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ানো, ওষুধ সরবরাহ ও রক্ষণাবেক্ষণে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়ন জরুরি।

ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শাদরুল আলম বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী স্বাস্থ্য খাতে জাতীয় বাজেটের অন্তত ১৫ শতাংশ বরাদ্দ প্রয়োজন। বর্তমানে ব্যক্তির নিজস্ব চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে প্রতিবছর প্রায় ২ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, সিভিল সার্জন ও স্বাস্থ্য প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক ইজাজ বলেন, স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম সমস্যা প্রশাসনিক অদক্ষতা। অনেক চিকিৎসক প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকলেও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে তাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের বড় অংশ প্রতিবছর অব্যবহৃত থেকে যায়, যা উন্নত সেবা নিশ্চিতের পথে বড় বাধা।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ বলেন, টেন্ডার ব্যবস্থার সংস্কার, গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রশংসাপ্রাপ্ত চৌগাছা মডেল প্রমাণ করেছে, জনসম্পৃক্ততা থাকলে সীমিত সম্পদ দিয়েও উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব।

সভাপতির বক্তব্যে ডা. ওয়ালীউল্লাহ বলেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে দুর্নীতি, দালালচক্র এবং কিছু অসাধু গোষ্ঠীর প্রভাব এখনো বড় সমস্যা। এতে সাধারণ রোগীরা ভোগান্তির শিকার হয়। তিনি যশোরের চৌগাছা স্বাস্থ্য মডেলের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, স্থানীয় জনগণ, শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন সম্ভব।

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

সাম্প্রতিক মন্তব্য