প্রাপ্তির পেয়ালা এর মধ্যেই কানায় কানায় পূর্ণ করে ফেলেছেন তিনি। অপূর্ণতা নামের কোনো শব্দও এখন আর তাঁর হৃদয়ে ঠাঁই নিয়ে থাকার কথা নয়।বাকি নেই ফুটবল থেকে আর কিছু পাওয়ারও। ক্যাবিনেটে একটা বিশ্বকাপ ট্রফি না থাকার যে দৃশ্যমান হাহাকার ছিল, ছিল, সেটিও মিলে গেছে কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে। পাওয়া যখন হয়ে গেছে সবই, তখন কাতার বিশ্বকাপেই লিওনেল মেসির শেষ দেখে ফেলেছিলেন অনেকে। কিন্তু সাধারণের ভাবনার অলিগলি ধরে চললে কি আর তিনি ইতিহাসের সেরা ফুটবলার হন! না, থেমে যাচ্ছেন বলে সবাই ভাবলেও তিনি থামলেন না।আরো চারটি বছর দিব্যি ফুটবল মাঠে পার করে দিলেনই না শুধু, মাত করতে চলে এলেন আরেকটি বিশ্বকাপেও। আলজেরিয়ার বিপক্ষে মাঠে পা রাখা মাত্রই বনে গেলেন ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলা ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার। মাঠে নেমে একের পর এক ঝলকে এটিও জানালেন যে আরো অনেক ‘প্রথম’ তাড়া করা বাকি তাঁর। তাড়া করলেনও।
এক, দুই, তিন—বিশ্বকাপে নিজের প্রথম হ্যাটট্রিকে দলকে আলজেরিয়ার বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয় এনে দিলেন তো বটেই, আরেকটি তালিকায় নিজের নামটি সবার ওপরে বসানোর জন্য গোটা বিশ্বকে রাখলেন পরের ম্যাচের অপেক্ষায়ও। মিরোস্লাভ ক্লোসাকে (১৬ গোল) ছুঁয়ে ফেলা মেসি এখন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাও হওয়ার পথে।
অথচ বয়স ৩৮ হয়ে গেছে বলে তাঁর পুরনো সৃষ্টিশীল সুন্দর আগের মতো দেখা যাবে কি না, তা নিয়েও বিস্তর জল্পনা-কল্পনা হয়ে গেছে। কিন্তু মাঠে নামতেই তাঁকে ঘিরে নিরন্তর মুগ্ধতা। এই ম্যাচ দিয়েই ২০২৬ বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হয়েছে আর্জেন্টিনার।ম্যাচটা যখন শেষ হলো, মেসি-বন্দনায় একাকার ফুটবলবিশ্ব। তা এই বুড়ো বয়সে কি করলেন মেসি? না, এবার প্রশ্নটা হওয়া উচিত কি করলেন না মেসি? ম্যাচজুড়ে আর্জেন্টিনারই যে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, তা নয়। টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচ হিসেবে বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের এটুকু ছাড় দেওয়াই যায়। কিন্তু মেসি? আর্জেন্টিনা যা খেলেছে, পুরোটাই তো খেললেন তিনি। তিন গোলের তিনটিই তাঁর পা থেকে। এর আগে পাঁচটি বিশ্বকাপ খেলে ফেললেও হ্যাটট্রিকের সঙ্গে পরিচয় ছিল না তাঁর। ২০১৪ সালে নাইজেরিয়া ও গত বিশ্বকাপের ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে জোড়া গোলই ছিল এক ম্যাচে সর্বোচ্চ। ছোট্ট এই অপূর্ণতাও বিলীন করে এখন ছুটছেন ক্লোসাকে পেছনে ফেলতেও।
নিজের রেকর্ড যে মেসির পায়ে বিসর্জনে যাবে, সেটি তো মাত্র কয়েক দিন আগেই শোনা গিয়েছিল খোদ জার্মানির সাবেক স্ট্রাইকার ক্লোসার মুখে। তিনি বলেছিলেন, সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড যদি কারো কাছে হারাতেই হয়, তবে সেটি তিনি মেসির কাছেই হারাতে চান। কথাটা মেসির কান পর্যন্ত হয়তো পৌঁছায়নি! কিংবা হয়তো পৌঁছেছে। তাতে কী? মেসির কাছে এটা যে শুধুই একটি সংখ্যা, ‘আমার কাছে এর কোনো অর্থ নেই (বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা)। আমাদের দেখা সেরাদের একজন রোনালদো (রোনালদো নাজারিও)। কিন্তু তিনি প্রথম স্থানে নেই। সুতরাং এটা শুধুই একটা পরিসংখ্যান।’ তা বিনয়ের অবতার মেসির কাছে এমন মনে হতেই পারে। কিন্তু এই সংখ্যাটার তো একটা ঐতিহাসিক মহিমা আছে। প্রথম গোলে যেমন জার্মান কিংবদন্তি জার্ড মুলারের পাশাপাশি মেসি ছুঁয়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পেকেও (ফ্রান্স-সেনেগাল ম্যাচটি আগে হয়েছে)। দুই গোল করে এমবাপ্পে মুলারের (১৪ গোল) পাশে বসার ঘণ্টাপাঁচেকের মধ্যেই আলজেরিয়ার বিপক্ষে মেসির প্রথম গোল। ম্যাচের তখন মাত্র ১৭ মিনিট। ডি বক্সের বাইরে থেকে বাঁ পায়ের ট্রেডমার্ক শটে দলকে ১-০ গোলে এগিয়ে দেন মেসি। এর আগেও একটি গোল করেছিলেন, তবে সেটি অফসাইডের কারণে বাতিল হয়।
দ্বিতীয় গোলে মেসি স্পর্শ করেন তাঁর প্রিয় রোনালদো নাজারিওকে (বিশ্বকাপে ১৫ গোল)। এই ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তির জন্যই মেসির সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকাটি শুধুই সংখ্যা ছাড়া আর কিছু মনে হচ্ছে না! সেই মুহূর্তটি আসে ম্যাচের ৬০ মিনিটের সময়। বক্সের অনেকটা বাইরে থেকে গোলবারে মূলত শট নিয়েছিলেন অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। সেই শট ঠেকিয়ে দিলেও বলের নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেননি আলজেরিয়ার গোলরক্ষক লুকা জিদান। ফিরে আসা বল আলতো টোকায় জালে পাঠান মেসি। ম্যাচের সবচেয়ে সুন্দর গোলটি মেসি বোধ হয় জমিয়ে রেখেছিলেন বিশ্বকাপে প্রথম হ্যাটট্রিক আর সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনে বসতে। ম্যাচের তখন ৭৭ মিনিট। আবারও বক্সের বাইরে থেকে বাঁ পায়ের বাঁকানো শটে আলজেরিয়ার জাল খুঁজে নেন মেসি। ঠিক কতবার এমন দৃশ্য দেখলেন? উত্তরটা খুবই সহজ—বছরের পর বছর, অগণিতবার। আর একটি গোল। তাহলেই তিনি বসে যাবেন সিংহাসনে। অথচ নিজের প্রথম দিককার বিশ্বকাপগুলোতে নামের সঙ্গে মানানসই উজ্জ্বলতা ছিল না বলে নিন্দুকদের মুখে প্রশ্ন লেগেই থাকত। তবে তৃতীয় বিশ্বকাপ খেলতে গিয়ে সব প্রশ্ন রীতিমতো আটলান্টিকেই ছুড়ে ফেলেছিলেন। ২০১৪-এর ব্রাজিল বিশ্বকাপে দল শিরোপার দুয়ার থেকে ফিরে এলেও মেসি হয়েছিলেন সেরা খেলোয়াড়। গত বিশ্বকাপে তো সোনালি ট্রফিটাই জেতা হয়ে গেছে। এই বিশ্বকাপ মেসির শুধুই নিজেকে উপভোগের আর ছাড়িয়ে যাওয়ার। অবশ্য সেটিও তো হয়ে গেছে! জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ বলছেন বলে কথা! সেই ইব্রাহিমোভিচ, পুরোটা জীবন যিনি নিজের স্তুতি গাইতে গাইতেই কাটিয়ে দিয়েছেন, তিনিই কি না ম্যাচ-পরবর্তী বিশ্লেষণে বলেছেন, ‘সে (মেসি) যদি এই বিশ্বকাপটা জেতে, ওর ক্যাবিনেটে আরেকটা ট্রফি উঠবে। এখন এটা জেতা-না জেতায় কিছু যায়-আসে না। সে এখন ফুটবলের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে।’ ফক্স স্পোর্টসের স্টুডিওতে তাঁর পাশেই বসা মেসির আরেক বার্সেলোনা ক্লাব সতীর্থ থিয়েরি অঁরির জন্য কিছুতেই বিশ্বাস হতে চাইছিল না যে ওই কথাগুলো ইব্রাহিমোভিচ বলছেন! অবিশ্বাসের চোখে টেবিলের দিকে তাকিয়ে থাকা অঁরির মুখে তাঁর সেই চিরচেনা মুচকি হাসি। হয়তো ভাবছিলেন, নামটা মেসি বলেই ইব্রাহিমোভিচও ভক্ত বনে গেছেন!


