২০২১ সালের আলোচিত বোট ক্লাবকাণ্ডে অভিনেত্রী পরীমণির অভিযোগে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিনোদনজগৎ একসঙ্গে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। সেই ঘটনার তদারকি কর্মকর্তা এডিসি গোলাম সাকলায়েনের সঙ্গে পরীমণির ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা নিয়ে পরবর্তী সময়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়। আর এখন সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দুবাইয়ে গ্রেপ্তার, এরপর সামাজিক মাধ্যমে পরীমণির প্রতিক্রিয়া এবং সাকলায়েনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে পুরোনো সেই ঘটনার ছায়া আবার ফিরে এসেছে আলোচনায়।
যে ঘটনায় শুরু: ২০২১ সালের ১৪ জুন সাভার থানায় পরীমণি অভিযোগ করেন, একই বছরের ৯ জুন তাকে বোট ক্লাবে হেনস্তা ও ধর্ষণচেষ্টা করা হয়েছে। তার অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। পরীমণির করা মামলাটি তদন্ত করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তৎকালীন ডিবি গুলশানের অতিরিক্ত কমিশনার গোলাম সাকলায়েন ছিলেন ওই মামলার তদারকি কর্মকর্তা। মামলার তদন্ত ও তদারকির সূত্রে পরীমণির সঙ্গে তার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা হয়।
তদারকি কর্মকর্তা থেকে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু: পরীমণির করা মামলার তদন্ত চলাকালেই ওই বছরের আগস্টে বনানীতে তার বাসায় অভিযান চালায় র্যাব। ‘বিপুল পরিমাণ’ মাদকসহ গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। পরীমণি গ্রেপ্তার হওয়ার কিছুদিনের মধ্যে তদারকি কর্মকর্তা সাকলায়েনের সঙ্গে তার অন্তরঙ্গ ছবি ও ভিডিও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়। সিসিটিভি ফুটেজ, বাসায় যাতায়াত এবং একসঙ্গে সময় কাটানোর অভিযোগ সামনে এলে পুলিশ সদর দপ্তর তদন্ত কমিটি গঠন করে। একই সময়ে সাকলায়েনকে ডিবির দায়িত্ব থেকে সরিয়ে অন্যত্র বদলি করা হয়।
পরে পুলিশি তদন্তে তাদের সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ উঠে আসে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত তদন্ত-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় পরীমণির সঙ্গে সাকলায়েনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল বলে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পিএসসিকে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়, সাকলায়েন ডিবির গুলশান বিভাগে থাকার সময় পরীমণির সঙ্গে ঘটনাক্রমে দেখা হয় তার। এরপর শুরু হয় যোগাযোগ। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি নায়িকা পরীমণির বাসায় নিয়মিত রাতযাপন করতে শুরু করেন।
পুলিশ অধিদপ্তরের এলআইসি শাখা (বৈধ আড়িপাতার দায়িত্বে থাকা) থেকে পাওয়া সাকলায়েনের মোবাইলের সিডিআর (বিস্তারিত কল রেকর্ড প্রতিবেদন) বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা দেখেছেন, ২০২১ সালের ৪ জুলাই থেকে পরের এক মাসে সাকলায়েন বিভিন্ন সময়ে পরীমণির বাসায় অবস্থান করেন।
নায়িকা পরীমণির মোবাইলের ফরেনসিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় তদন্তকারীরা দেখেছেন, পরীমণির সঙ্গে সাকলায়েনের কথোপকথন চলত। তা সাধারণ পরিচিতি বা পেশাগত প্রয়োজনে স্থাপিত কোনো সম্পর্কের নয়, বরং অনৈতিক প্রেমের সম্পর্ক।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, রাজারবাগ মধুমতি পুলিশ অফিসার্স কোয়ার্টার্সে পরীমণির যাতায়াতের সিসিটিভি ফুটেজ রয়েছে। এর ফরেনসিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে ও সাক্ষীদের জবানবন্দি অনুযায়ী প্রতীয়মান হয় যে, সাকলায়েনের পূর্বপরিকল্পনা ও সম্পূর্ণ জ্ঞাতসারে তার স্ত্রী না থাকা অবস্থায় পরীমণি তার (সাকলায়েন) রাজারবাগের সরকারি বাসায় যান। সেখানে প্রায় ১৭ ঘণ্টা অবস্থান করে ২০২১ সালের ২ আগস্ট রাত দেড়টায় বাসা ত্যাগ করেন।
সাকলায়েন পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হয়ে সরকারি দায়িত্বের বাইরে নায়িকা পরীমণির সঙ্গে অতিমাত্রায় ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন বলে উল্লেখ করা হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে।
এতে বলা হয়, সাকলায়েন বিবাহিত ও এক সন্তানের জনক। এরপরও পরীমণির সঙ্গে তার বিয়েবহির্ভূত অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন, পরীমণির সঙ্গে জন্মদিন উদযাপন এবং নিজের সরকারি বাসভবনে নিজ স্ত্রীর অবর্তমানে সময় কাটানোর মতো ঘটনা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, এ ঘটনায় সাকলায়েনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে। তাকে কারণ দর্শানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তিনি অভিযোগ থেকে অব্যাহতির দাবি করেছিলেন। তবে জবাব সন্তোষজনক হয়নি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে ওই বছরের ১৩ জুন পিএসসিকে এ চিঠি দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা-২০১৮ অনুযায়ী ‘অসদাচরণের’ কারণে সাকলায়েনকে ‘গুরুদণ্ড’ হিসেবে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর প্রদানের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় তৎকালীন এডিসি ও বর্তমানে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. গোলাম সাকলায়েনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর জন্য প্রস্তুতকৃত প্রজ্ঞাপনের সারসংক্ষেপে এরই মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্বাক্ষর করেছেন। এখন সারসংক্ষেপটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হয়ে রাষ্ট্রপতির দপ্তরে পাঠানো হবে। পরে রাষ্ট্রপতির আদেশে তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। শিগগির এসব প্রক্রিয়া শেষ হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
বেনজীরের নাম কেন আসে: পরীমণি ঘটনার সময় বেনজীর আহমেদ তৎকালীন আইজিপি ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি ঢাকা বোট ক্লাবের সভাপতি ছিলেন। যদিও বোট ক্লাবকাণ্ডের মামলায় তিনি কোনো আসামি ছিলেন না এবং তার বিরুদ্ধে ওই ঘটনায় কোনো অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
তবে ২০২৫ সালে ঢাকা বোট ক্লাবের বর্তমান সভাপতি ও পরীমণির মামলার আসামি নাসির মাহমুদ সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, বোট ক্লাবকাণ্ডের পেছনে তৎকালীন ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের প্রভাব ছিল এবং তিনি নিজেও ওই ঘটনার পর বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। একই সংবাদ সম্মেলনে তিনি পরীমণি ও বেনজীরের সম্পর্ক নিয়েও কিছু দাবি করেন।
পরীমণিকাণ্ডের পরে নাসির মাহমুদ তিন বছর বোট ক্লাবে যেতে পারেননি বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, আমাকে উনি (বেনজীর) তিন বছর ক্লাবে আসতে দেননি। আমি বোট ক্লাবে এলে গুম করা হতো, আয়নাঘরে নিয়ে যাওয়া হতো। তার বাহিনী দিয়ে তিনি অনেক কিছুই করতে পারতেন। আমি ভয়ে আসিনি। তার অনেক ক্ষমতা ছিল, আমি শুধু একজন সাধারণ ব্যবসায়ী। তার সঙ্গে ফাইট দেওয়ার মতো অবস্থান আমার ছিল না। তবে আমি হাল ছাড়িনি, আইনি লড়াই করে গেছি। আমি তিনবার তার (বেনজীর) নামে লিগ্যাল নোটিশ দিয়েছি।
নতুন করে আলোচনায় কেন: সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুদকের করা মামলার নথি দিয়ে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারি করে গত বছরের ১১ এপ্রিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ১২ জুন দুবাইতে গ্রেপ্তার হন বেনজীর। তাকে দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
এদিকে দুবাইতে বেনজীর গ্রেপ্তারের খবরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন পরীমণি। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের খবর সংবলিত একটি ফটোকার্ড শেয়ার করে লিখেন, ‘মজা’।
এক শব্দের লিখাটি নিয়ে পরীমণি কোনো ব্যাখ্যা না দিলেও নেটিজেনরা তাদের আলোচনায় ফিরে যাচ্ছে সেই বোট ক্লাবকাণ্ডে। কারণ বোট ক্লাবের ঘটনা, নাসির গ্রেপ্তার, পরীমণির বাসায় অভিযান, মাদক উদ্ধার—এসবই হয়েছে বেনজীর আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়। এ ‘মজা’ লিখাটির মাধ্যমে সেই ঘটনাই আবার ফিরে আসছে।
এক ঘটনার তিন অধ্যায়: সংশ্লিষ্টদের মতে, বোট ক্লাবকাণ্ড শুধু একটি ফৌজদারি অভিযোগের ঘটনা ছিল না; এটি পরবর্তী সময়ে ক্ষমতা, প্রভাব, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাগত নৈতিকতা এবং তারকাখ্যাতিকে ঘিরে জাতীয় বিতর্কে রূপ নেয়। সেই বিতর্কের এক প্রান্তে ছিলেন অভিযোগকারী পরীমণি, অন্য প্রান্তে তদন্ত কর্মকর্তা সাকলায়েন এবং পটভূমিতে তৎকালীন আইজিপি বেনজীর আহমেদ।


