- বিরোধীদের অভিযোগ, সরকার আগে ব্যয় করে পরে অনুমোদন চাইছে
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ৫৬ হাজার ১১৭ কোটি ৫৯ লাখ ৪১ হাজার টাকার সম্পূরক (সংশোধিত) বাজেট জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে।
সোমবার সংসদ অধিবেশনে ‘নির্দিষ্টকরণ (সম্পূরক) বিল-২০২৬’ পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। পরে বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়। এ সময় অর্থমন্ত্রী জানান, অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা মোকাবেলার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করা বিএনপির সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।
এদিকে অর্থবছরের শেষ সময়ে সম্পূরক বাজেটের মাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যয়ের অনুমোদন নেওয়ার প্রচলিত প্রক্রিয়া নিয়ে জাতীয় সংসদে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা। তাঁরা বাজেট বাস্তবায়ন সক্ষমতা, অর্থপাচার ও ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে কঠোর সমালোচনার পাশাপাশি অভিযোগ করেছেন, সরকার আগে ব্যয় সম্পন্ন করে পরে সংসদের অনুমোদন চাইছে।
এতে সংসদের আর্থিক নজরদারি ও অনুমোদনের সাংবিধানিক ক্ষমতা কার্যত আনুষ্ঠানিকতায় সীমিত হয়ে যাচ্ছে।
গতকাল স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেট ও ছাঁটাই প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন বিরোধীদলীয় ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা।
আলোচনার শুরুতেই জামায়াতের সংসদ সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীন খরচের পর অনুমোদন নেওয়ার প্রচলিত রীতির সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, সম্পূরক বাজেটের ওপরে যে খরচ করে পরে অনুমোদন নেওয়া হয়, এই প্র্যাকটিসটা বন্ধ হওয়া দরকার। এটা দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো হবে।
জামায়াতের মোহাম্মদ নাজিবুর রহমানও একই প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, সংবিধানের ৯১ অনুচ্ছেদের আওতায় সরকার অতিরিক্ত ব্যয় করে পরে তা সম্পূরক বাজেট হিসেবে সংসদে অনুমোদনের জন্য আনে। খরচ হয়ে যাওয়ার পরে সম্পূরক বাজেট সংসদে আসে। তখন সংসদের সামনে অনুমোদন দেওয়া ছাড়া আর কোনো বাস্তব বিকল্প থাকে না।সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৯ অনুযায়ী সংশোধিত বাজেট ‘যথাসম্ভব’ মার্চ মাসের মধ্যে সংসদে উপস্থাপনের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, দেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা উদ্বেগজনক। জিডিপির আকার প্রায় ৬৮ লাখ কোটি টাকা হলেও প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৩.৪৯ শতাংশে। মূল্যস্ফীতি এখনো ৯.৫ শতাংশের ঘরে রয়েছে। অন্যদিকে খেলাপি ঋণ মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩৫.৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যার পরিমাণ প্রায় ছয় লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এই পরিস্থিতি দেশের আর্থিক খাতের গভীর সংকটের ইঙ্গিত বহন করে।
অর্থপাচারের প্রসঙ্গ টেনে রুমিন ফারহানা বলেন, শ্বেতপত্র অনুযায়ী গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইন্টেগ্রিটির তথ্য অনুযায়ী, ওভার ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে প্রতিবছর প্রায় আট বিলিয়ন ডলার বিদেশে চলে গেছে। তিনি বলেন, ব্যাংক খাতকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বলেন, অর্থপাচার ও রপ্তানি খাতের দুর্বলতা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শ্বেতপত্রে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচারের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে দেশ ক্রমেই আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ছে, কিন্তু রপ্তানি সেই হারে বাড়ছে না। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ছে। তিনি বলেন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সামাজিক সুরক্ষার নামে বরাদ্দ বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে দেওয়ায় প্রকৃত উপকারভোগীরা কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাচ্ছেন না।
একই দলের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল গফুর বলেন, সাধারণ মানুষ যখন চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বাজার নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু কার্যকর বাজার তদারকির পরিবর্তে সরকার অতিরিক্ত বরাদ্দ চাইছে।
সদস্যদের বক্তব্যের জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের আগে সংসদের অনুমোদন নেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে সংসদের ভূমিকা আরো শক্তিশালী হতো। তবে নানা কারণে এটা হয়তো সম্ভব হয় না।
এ বিষয়ে চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম বলেন, মার্চ মাসে সম্পূরক বাজেট দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়, কারণ অর্থবছরের শেষ দিন পর্যন্ত ব্যয় অব্যাহত থাকে।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে সম্পূরক বাজেট উত্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে সরকারের নিট ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছিল সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। তবে নির্বাচন-পূর্ববর্তী সময়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের গতি কিছুটা মন্থর হওয়ায় সংশোধিত বাজেটে সরকারি ব্যয় দুই হাজার কোটি টাকা হ্রাসের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংশোধিত বাজেটে মোট ঘাটতির প্রস্তাব করা হয়েছে দুই লাখ কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৩.৩ শতাংশ।
অর্থমন্ত্রী জানান, সরকারি ব্যয়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে অপচয় কমানো, অগ্রাধিকারহীন ব্যয় সংকোচন এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রে মিতব্যয়িতা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি সমন্বয় করতে হলেও ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং ইমাম, পুরোহিত ও মুয়াজ্জিনদের সম্মানী দেওয়ার মাধ্যমে দেশের সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমকে আরো মর্যাদাপূর্ণ ও সম্প্রসারিত করা হয়েছে। এই কার্যক্রমগুলোর প্রয়োজনেই সম্পূরক বাজেটে ব্যয় ও ঘাটতির কিছুটা সমন্বয় করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের পর স্পিকার সংসদের কার্যসূচি অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত দায়যুক্ত ব্যয় ব্যতীত অন্যান্য ব্যয় সম্পর্কিত মঞ্জুরি দাবির ওপর ভোট গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করেন। সংবিধানের ৮৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দায়যুক্ত ব্যয় সংসদে আলোচিত হলেও তা ভোটের আওতাভুক্ত নয় বলে জানান। তিনি বলেন, এবারের সম্পূরক বাজেটে মোট ২৫টি মঞ্জুরি দাবি রয়েছে। এসব দাবির বিপরীতে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা ও শাহজাহান চৌধুরীসহ বিরোধী দলের ২০ জন সংসদ সদস্য মোট ৩০৪টি ছাঁটাই প্রস্তাবের নোটিশ দিয়েছেন।
এদিকে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট সময়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অর্থ বিভাগ, পরিকল্পনা বিভাগ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনসহ মোট আটটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ খাতে ছাঁটাই প্রস্তাব উত্থাপন ও আলোচনার তালিকা দেওয়া হয়। কণ্ঠভোটে ছাঁটাই প্রস্তাবগুলো নাকচ করা হয়।
এরপর ‘নির্দিষ্টকরণ (সম্পূরক) বিল-২০২৬’ কণ্ঠভোটে পাস হয়। ৩০ জুন শেষ হতে যাওয়া অর্থবছরের কার্যক্রম নির্বাহের জন্য সংযুক্ত তহবিল থেকে মঞ্জুরীকৃত অর্থের বেশি বরাদ্দ ও নির্দিষ্টকরণের কর্তৃত্ব দেওয়ার জন্য এই সম্পূরক বিল আনা হয়। চলতি অর্থবছরের বাজেটে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর অনুকূলে সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। সংশোধিত বাজেটে ২৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বরাদ্দ বেড়েছে ৫৬ হাজার ১১৭ কোটি ৫৯ লাখ ৪১ হাজার টাকা।


