একশ দিনের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছে বলে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। সম্ভাব্য এই চুক্তি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে বিস্তৃত আলোচনার ভিত্তি তৈরি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে, লেবাননের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কোনো চুক্তিই দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
চুক্তির খবরে আন্তর্জাতিক বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তেলের দাম কমেছে, ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারও। বিশ্বনেতারাও সম্ভাব্য সমঝোতাকে স্বাগত জানিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চূড়ান্ত স্বাক্ষরের আগে চলতি সপ্তাহে কাতারের রাজধানী দোহায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এএফপিকে এক কূটনীতিক জানান, সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের আগে উভয় পক্ষের সঙ্গে পৃথক প্রস্তুতিমূলক বৈঠক হবে। তবে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ খসড়া এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় থাকা পাকিস্তান জানিয়েছে, আগামী শুক্রবার ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডে চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ কয়েক সপ্তাহের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টার পর সম্ভাব্য এই সমঝোতাকে ‘শান্তির পথে ঐতিহাসিক অগ্রগতি’ বলে মন্তব্য করেছেন।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি তুরস্ক, ইরাক ও মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে পৃথক টেলিফোন আলাপে বলেছেন, লেবাননের ওপর ইসরায়েলি হামলা পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে এবং যুদ্ধ-পরবর্তী কাঠামো বাস্তবায়নের দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রকেই নিতে হবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, হরমুজ প্রণালিতে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করলেও বলেন, আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের আগে ইরান কোনো শর্ত বাস্তবায়ন শুরু করবে না।
ট্রাম্পের বার্তা
রোববার নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ইরান যদি চূড়ান্ত পারমাণবিক সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক বিকল্প পুনর্বিবেচনা করবে। একই সঙ্গে বৃহত্তর পারমাণবিক ইস্যুগুলো নিয়ে পরবর্তী ৬০ দিন আলোচনা চলবে বলেও জানা গেছে।
পাকিস্তানের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই সময়ের মধ্যে সমাধান না এলে আলোচনার মেয়াদ আরও বাড়ানো হতে পারে।
যেসব বিষয়ে একমত দুই পক্ষ
রয়টার্সের উদ্ধৃত এক ইরানি কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৯ জুন খসড়া সমঝোতায় সম্মতির পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী চুক্তি সম্পাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
খসড়া সমঝোতা অনুযায়ী, ইরান অবিলম্বে হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ও পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত করবে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ তুলে নেবে।
অর্থনৈতিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করার প্রতিশ্রুতি দেবে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ইরানি তেল রপ্তানির ওপর আরোপিত বিধিনিষেধও শিথিল করা হবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানের জ্বালানি তেল বিক্রির সুযোগ বাড়বে।
এ ছাড়া বিদেশি ব্যাংকগুলোতে আটকে থাকা প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের ইরানি সম্পদ মুক্ত করার বিষয়েও নীতিগত সম্মতি হয়েছে বলে জানা গেছে।
পারমাণবিক ইস্যুতে ইরান প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জনের চেষ্টা করবে না। চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি সম্প্রসারণ কিংবা নতুন কোনো পারমাণবিক স্থাপনা নির্মাণ থেকেও বিরত থাকবে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই সমঝোতা
বিবিসির বিশ্লেষক টম বেটম্যানের মতে, উভয় পক্ষই দীর্ঘদিন ধরে চাপের মধ্যে ছিল। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছিল। অন্যদিকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও বন্দর অবরোধে ইরানের অর্থনীতি কঠিন সংকটে পড়েছিল। ফলে দুই দেশেরই উত্তেজনা প্রশমনের প্রয়োজন ছিল।
চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য হলো গত ৮ এপ্রিল কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ও পরিধি বাড়ানো। এর আওতায় আরও ৬০ দিন কোনো ধরনের শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ডে জড়াবে না দুই পক্ষ। বিনিময়ে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে।
ইসরায়েলের অস্বস্তি
সম্ভাব্য এই চুক্তি নিয়ে ইসরায়েলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। দেশটির ডানপন্থী গণমাধ্যমগুলোতে ইতোমধ্যে ট্রাম্পের সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অবস্থানের মধ্যে আগের মতো পূর্ণ মিল এখন আর নেই।


